৪০ বছর পর জনসংহতি সমিতি থেকে সাংসদ নির্বাচিত হলেন উষাতন তালুকদার

বিশেষ প্রতিবেদক, হিলবিডিটোয়েন্টিফোর ডটকম 

uuuhillbd24.com

৪০ বছর পর পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠন সন্তু লারমা সমর্থিত পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি(পিসিজেএসএস) থেকে সাংসদ হিসেবে নিবাচিত হয়েছেন উষাতন তালুকদার(হাতি)। ৫ জানুয়ারী অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সাংসদ নির্বাচনে রাঙামাটির ২৯৯ নং সংসদীয় আসন থেকে তিনি আওয়ামীলীগীগের প্রার্থী ও তিন বারের সাংসদ দীপংকর তালুকদারকে ১৮ হাজার ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে দেন। ১৯৭২ সালে পিসিজেএসএস-এর প্রতিষ্ঠাতা ও অসংবাদিত নেতা প্রয়াত মানবেন্দ্র নারায়ন লারমা(এমএন লারমা) পার্বত্য চট্টগ্রামে জনগনের প্রত্যক্ষ রায়ের সাংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। এবার দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তীব্র প্রতিদ্বন্ধীতার মধ্য দিয়ে নির্বাচিত হন এমএন লারমার প্রতিষ্ঠিত সংগঠনের অনুসারী উষাতন তালুকদার।

অপরদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের মধ্য থেকে পিসিজেএসএস এর নেতা উষাতন তালুকদার সাংসদ নির্বাচিত হওয়ায় পাহাড়ের রাজনীতিতে ঘটেছে নতুন মেরুকরণ। পাশাপাশি পিসিজেএসএস গনতন্ত্রের রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার পথে আরও একধাপ এগিয়ে গেল।

গত ৫ জানুয়ারী দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রাঙামাটির ২৯৯নং আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ও পিসিজেএসএস-এর নেতা উষাতন তালুকদার(হাতি) ও আওয়ামীলীগ প্রার্থী ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদারের(নৌকা) মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্ধিতার মধ্য দিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। অবশ্যই এ আসনে থেকে অপর ৪ জন প্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্ধিতা করলেও তারা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভোট পাননি। নির্বাচনী প্রচারনার শেষ দিনের আগে এই দুই প্রতিদ্বন্ধি পৃথক পৃথক সংবাদ সন্মেলনের মাধ্যমে একে অপরকে পোষ্টার ছিড়ে ফেলা, সমর্থকদের হুমকিসহ বিভিন্ন অভিযোগ তুলেছিলেন। কিন্তু ৫ জানুয়ারী নির্বাচন কোন প্রকার অপ্রীতিরকর ঘটনা ছাড়াই নির্বাচন অবাধ ও নিরপে নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছিল। ফলে রাঙামাটির এ সংসদীয় আসনে জাতীয় রাজনীতি দল বনাম আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের মধ্যে প্রতিদ্বন্ধিতায় হেরে যেতে হল জাতীয় রাজনৈতিক দল আওয়ামীলীগের প্রার্থীকে।

জেলা রির্টানিং কর্মকর্তার ঘোষিত ফলাফলে হাতি প্রতীক প্রার্থী উষাতন তালুকদার ১৮ হাজার ৮৫২ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন নৌকা প্রতীক প্রার্থী, বর্তমান সাংসদ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদারকে। এর মধ্যে উষাতন তালুকদার ভোট পান ৯৬,২৩৭ এবং দীপংকর তালুকদার মোট ভোট পেয়েছেন ৭৭,৩৮৫ ভোট। ফলে দীর্ঘ কয়েক যুগের পর পাহাড়ের আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল থেকে জনগনের প্রত্যক্ষ বিপুল ভোটে সাংসদ হিসেবে নির্বাচিত হওয়াতে এখন পাহাড়ে রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ ঘটেছে। পিসিজেএসএস গনতন্ত্রের রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার পথে আরও একধাপ এগিয়ে গেল রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারনা।

অবশ্যই ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের আগে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি(তৎকালীন শান্তিবাহিনী) সশস্ত্র আন্দোলনের সময়কালীন কয়েকটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গোপনে আওয়ামীলীগকে সমর্থক দিলে তিন পার্বত্য জেলা থেকে তিন সাংসদ বিপুল ভোটে জয়ী হন। কিন্তু পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরের পর পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সদস্যরা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার পর বিগত অষ্টম ও নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনগুলোতে এককভাবে প্রার্থী দিয়ে নিয়মিত তাক লাগালেও সফল হতে পারেননি। অবশেষে পর্ষন্ত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাঙামাটির আসন থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি থেকে একক প্রার্থী দিয়ে নির্বাচন করায় শতভাগ সফলতা লাভ করে। ফলে আগামীতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনসহ অন্যান্য নির্বাচনে পাহাড়ের আঞ্চলিক দলকে বাদ দিয়ে নির্বাচনে জয়যুক্ত হওয়া নিয়ে এখন জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলোকে একটা কঠিন চ্যালেঞ্জ-এ পড়তে হবে।

নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে, পার্বত্য মন্ত্রনালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দীপংকর তালুকদার পার্বত্য চুক্তির যথাযথ বাস্তবায়নের উদ্যোগ না নেয়া, পঞ্চদশ সংবিধান সংশোধনের মধ্য দিয়ে পাহাড়িদের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী হিসেবে অখ্যায়িত করায় পাহাড়ীদের ক্ষোভ রয়েছে। সর্বোপরি তিন তিনবার সাংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হওয়াতে দীপংকর তালুকদারের অংহকার ও অতি আত্ন বিশ্বাসী হয়ে উঠা, বিগত ৫ বছরে জেলা আওয়ামীলীগের ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন না করাসহ কয়েকটি কারনে তার পরাজয়ের কারণ। বিগত সময়ে দীপংকর তালুকদারের সাথে ছিল চাটুকার ও সুবিধাভোগীদের ভিড় ছিল। তিনি এসব বূঝেও না বুঝার ভান করে আত্ন অহংকারে বেড়াজালে আবদ্ধ ছিলেন। এছাড়া দীপংকর তালুকদার আদিবাসী বুদ্ধিজীবি ও বিশিষ্টজনদের কাছ থেকে অনেক যোজন দূরে রেখেছিলেন নিজেকে। ফলে পাহাড়ী সম্প্রদায়ও তার প্রতি অনেকটা বিমুখ হয়েছিল।

এদিকে, ১৯৭৩ সালের ১৮ মার্চ দেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পার্বত্য চট্টগ্রাম আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে পিসিজেএসএস থেকে প্রয়াত নেতা এমএন লারমা বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছিলেন। এরপর দীর্ঘ ৪০ বছর এমএন লারমার প্রতিষ্ঠিত সংগঠন পিসিজেএসএস থেকে উষাতন তালুকদার হাতি প্রতীক নিয়ে আওয়ামীলীগ প্রার্থীকে বিপুল ভোটের হারিয়ে দিয়ে জয়ী হলেন।

পাহাড়ে আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল পিসিজেএসএস থেকে উষাতন তালুকদার সাংসদ হিসেবে নির্বাচিত হওয়াতে আদিবাসী সংগঠনসহ বিভিন্ন সংগঠন থেকে অভিনন্দন জানাতে ভিড় লেগেছে। মঙ্গলবার(৭জানুয়ারী) বাংলাদেশ ইউনিয়ন পরিষদ ফোরাম রাঙামাটি শাখাসহ অনান্য সংগঠনের পক্ষ থেকে নব নির্বাচিত সাংসদ উষাতন তালুকদারকে তার বাসভবনে ফুলের তোড়া দিয়ে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানাতে যান। এসময় ইউনিয়ন পরিষদ ফোরামের রাঙামাটির সভাপতি অরুন কান্তি চাকমা, বালুখালী ইউপি চেয়ারম্যান বিজয়গিরি চাকমাসহ সদর উপজেলায় নির্বাচিত ইউপি চেয়ারম্যানরা উপস্থিত ছিলেন।
–হিলবিডি২৪/সম্পাদনা/সিআর

Print Friendly