কাপ্তাই হ্রদের পানির স্তর কমে যাওয়াতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে হ্রাস ও নৌযোগাযোগ ব্যাহত

বিশেষ প্রতিবেদক, হিলবিবিটোয়েন্টিফোর ডটকমKaptai Lake dry Pic11

প্রচন্ড খরা ও অনাবৃষ্টিতে কাপ্তাই হ্রদে পানির স্তর কমে অস্বাভাবিকভাবে কমে গেছে। ফলে কাপ্তাই জল বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে বিদ্যূৎ উৎপাদন হ্রাস ও নৌযোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অপরদিকে হ্রদের পানি কমে যাওয়াতে জেলার দশ উপজেলার মধ্যে ছয় উপজেলায় নৌযোগাযোগে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

একাধিক সূত্রে জানা গেছে, কাপ্তাই বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ৫টিঁ ইউনিট সচল থাকলেও হ্রদে কাঙ্খিত পরিমাণ পানি না থাকায় কর্তৃপক্ষ এখন সব ইউনিট চালিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারছে না। ২শ ৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা সম্পন্ন এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রে এখন ২টি ও পিক আওয়ারে ৩টি জেনারেটর থেকে দৈনিক ৮০ থেকে ৯০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন যা স্বাভাবিকের চেয়ে ১শ ৫০ মেগাওয়াট কম। কাপ্তাই বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে গত রোববার বিকালে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী গতকাল কাপ্তাই হ্রদে পানির স্তর ছিল ৭২.১৫ এমএসএল(মেইন সি লেভেল)। কিন্তু এই সময়ে পানির স্তর থাকার কথা ৭৯ দশমিক দশমিক ৬৮ এমএসএল। যা স্বাভাবিকের চেয়ে হ্রদে পানির স্তর ৬ থেকে সাড়ে ৭ এমএসএল কম। এদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য হ্রদ থেকে প্রতিদিন পানি ছেড়ে দেয়ায় হ্রদে ক্রমাগত হারে পানির স্তর নিচে নেমে এসেছে। এ অবস্থায় খরা ও অনাবৃষ্টির প্রেক্ষিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিস্থিতি নিয়ে শংকা প্রকাশ করেন সংশ্লিষ্টরা।

অপরদিকে হ্রদে পানি কমে যাওয়ায় রাঙামাটি জেলার ৬ উপজেলা বিলাইছড়ি,জুরাছড়ি,বরকল,লংগদু,নানিয়ারচর ও বাঘাইছড়ি উপজেলায় নৌযোগাযোগে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। হ্রদে পানি থাকার সময় ইঞ্জিন বোটযোগে কাপ্তাই উপজেলা সদর থেকে বিলাইছড়ি সদর উপজেলায় পৌঁছতে দেড়-দুই ঘন্টা সময়ে লাগে। কিন্তু বর্তমানে পানি কমে যাওয়ায় বিকল্প ও সরু পথে তিন ঘন্টা সময়ের অধিক সময় ব্যয় হচ্ছে। তাছাড়া এসব্যান্ড মোড় শুকিয়ে যাওয়ায় রাঙামাটি ও কাপ্তাই থেকে কোন ইঞ্জিন বোট ওই পথে যেতে পারছে না। ফলে যাএীদের পায়ে হেঁটে শুকিয়ে যাওয়া স্থান কিছুদূর পায়ে হেঁটে ছোট ছোট ইঞ্জিন বোটে করে বিলাইছড়ি আসা-যাওয়া করতে বাধ্য হচ্ছে। এছাড়া জুরাছড়ি,বরকল,লংগদু,নানিয়ারচর ও বাঘাইছড়ি উপজেলায় নৌপথে যাতায়াত দুরুহ হয়ে পড়েছে। হ্রদের বিভিন্ন স্থানে চর জেগে বোট চলাচলের অনুপযোগী হওয়ায় দীর্ঘ সময় যাএীদের পায়ে হেঁটে গন্তব্যে পৌঁছতে হচ্ছে। এভাবে যাতাযাতে যাএীদের যেমনি সময় লাগছে তেমনি চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। এ অবস্থায় ওসব এলাকার উৎপাদিত বিভিন্ন মৌসুমী ফল ও কৃষিপণ্য কৃষকরা সঠিকভাবে বাজারজাত করতে পারছে না। ফলে কৃষকরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। আর নৌযান চলাচলে অচলাবস্থা ও পরিবহনে সমস্যাজনিত কারণে ওসব এলাকায় বিভিন্ন পণ্যের দাম স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি। অনেকের মতে, কাপ্তাই হ্রদ সৃষ্টির পর থেকে হ্রদে কোন ড্রেজিং না হওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে হ্রদ এলাকায় নৌযান চলাচলে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয় এবং কাপ্তাই বিদ্যুৎ কেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়।

ফারুয়া ইউপি চেয়ারম্যান তেজেন্দ্র লাল তংচংগ্যা জানান, বিলাইছড়ি থেকে ফারুয়ায় ছোট ডিঙি নৌকার ইঞ্জিন বোটে যেতে পুরো দিন সময় লাগে আর যাএীদের কাদায় নেমে বোট ঠেলে ও পায়ে হাঁটতে হয়।

কাপ্তাই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মোঃ আব্দুর রহমান হ্রদে পানির স্তর কমে যাওয়াতে বিদ্যুৎ উৎপাদন হ্রাস পাওয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, রুলকার্ভ অনুযায়ী লেকে ৭৯ দশমিক ৬৮ এমএসএল পানি থাকার কথা। কিন্তু হ্রদে পানির স্তর হ্রাস পাওয়ায় বর্তমানে ৭২ দশমিক ১৫ ফুট এমএসএল রয়েছে। যা রুলকার্ভের চেয়ে লেকে ৬ থেকে সাড়ে ৭ফুট এমএসএল পানি কম রয়েছে হ্রদে পানির স্তর ৬৮ এমএসএল পর্যন্ত থাকলে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব।

তিনি আরও বলেন, হ্রদের পানি স্বল্পতার কারণে বর্তমানে এই কেন্দ্রে ৫টি ইউনিট চালিয়ে পূর্ণাঙ্গ বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না। এখন ২টি ও পিক আওয়ারে ৩টি ইউনিট চালাতে হচ্ছে। এভাবে পানি কমে গেলে মাত্র ১টি ইউনিট চালানো সম্ভব হবে।

তিনি বলেন, গত ১৪ জুন ৬২ মেগাওয়াট,১৩ জুন ৮৬ মেগাওয়াট ও এর আগের দিন ৯০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছিল। এখন দৈনিক গড়ে ৮০ থেকে ৯০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। বৃষ্টি হতে পারে এবং হ্রদে পানি বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদনও বাড়বে। তাই বৃষ্টি হয়ে পানি বাড়ার অপেক্ষা করা হচ্ছে বলে জানান। আর হ্রদে পানি না হলে যেভাবে চলছে এরকম চললে আরও ৮ থেকে ১৫দিন পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে। এখন বিদ্যুৎ উৎপাদন বিপর্যস্ত হওয়ার কারণে জাতীয় গ্রীডে বিদ্যুৎ বিতরণেও সমস্যা দেখা দিয়েছে। ফলে লোডশেডিং এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
–হিলবিডি২৪/সম্পাদনা/সিআর.

Print Friendly