স্বাধীনতার ৪৩ বছরেও খাগড়াছড়ি’র মহালছড়ি উপজেলার তিন শহীদের সরকারী স্বীকৃতি মিলেনি

খাগড়াছড়ি প্রতিবেদক,হিলবিডিটোয়েন্টিফোর ডটকম

Khag map

স্বাধীনতার ৪৩ বছরেও খাগড়াছড়ির মহালছড়ি উপজেলার মুক্তিযুদ্ধে তিন শহীদেও স্বীকৃতি মিলেনি। তারা হলেন চিত্তরঞ্জন কার্বারী, সব্যসাচী মহাজন এবং গৌরাঙ্গ মোহন দেওয়ান। এঁরা তিনজনই খাগড়াছড়ির মহালছড়ি উপজেলার যুদ্ধকালীন সংগঠক। ছিলেন সংগ্রাম কমিটি এবং আওয়ামীলীগের নেতৃস্থানীয়ও।

জানা যায়, ১৯৭১ সালের ১৩ মে ‘মহালছড়ি’ পতনের পর পাক হায়েনারা স্থানীয় জাগির বিহারীর নেতৃত্বে এলাকার সম্ভ্রান্ত এই তিন ব্যক্তিকে ঘর থেকে তুলে এনে গুলী করে হত্যা করা হয়। শুধু তাই নয়, পাওয়া যায়নি এই তিন শহীদের অস্থি-কংকালও। তাই প্রতিবছর বিজয়ের মাস ‘ডিসেম্বর’ এলেই এসব পরিবারে নেমে আসে শোকের পাহাড়।

শহীদ চিত্তরঞ্জন কার্বারী, সব্যসাচী মহাজন এবং গৌরাঙ্গ মোহন দেওয়ানের উত্তরসূরীরা খুঁজে পাননি, বাবাদের মরদেহ। তাই, সরকার প্রতিষ্ঠিত জেলা স্মৃতিসৌধ হলেও অন্ততঃ তাঁদের নাম দেখতে চান, তাঁদের সন্তানরা।

বিষয়টি মহালছড়ি কিংবা খাগড়াছড়ি’র যুদ্ধকালীন সন্মুখ যোদ্ধা থেকে শুরু করে সবারই জানা। এই তিন ব্যক্তি-ই মহান মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে মাঠে সক্রিয় ছিলেন। মাইসছড়ি বাজারের কুখ্যাত ‘জাগির বিহারী’-ই তাঁদেরকে একজন একজন করে ঘর থেকে তুলে নেয়ায় ভূমিকা পালন করে। তারপর, মহালছড়ি’র প্রাচীনতম ‘বাংলো’র পেছনেই তাঁদের জীবনপ্রদীপ নিভিয়ে দেয়া হয়।

মহালছড়ি উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সাবেক কমান্ডার হাজী মোবারক আলী মাষ্টার জানান,জীবনের শেষ বয়সে এসেও গর্বের সাথে স্বীকার করতেই হবে। চিত্তরঞ্জন কার্বারী, সব্যসাচী মহাজন ও গৌরাঙ্গ দেওয়ান; তিনজন-ই মহালছড়ি উপজেলায় মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে সংগ্রাম কমিটিতে যেমন সক্রিয় ছিলেন, তেমনি সহযোগিতা করেছেন, মুক্তিযোদ্ধাদেরকেও।

তিনি এই তিন ব্যক্তিকে সরকারীভাবে মুক্তিযুদ্ধের শহীদ স্বীকৃতি এবং জেলাসদরের সরকারী স্মৃতিসৌধে নাম খচিত করার দাবী জানান।

১৯৭১ সালে কলেজ পড়–য়া, স্বপন চক্রবর্তী যুদ্ধে ছুটে গিয়েছিলেন জাতির পিতার স্বাধীনতার ঘোষণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে। তিনি বলেন, এপ্রিলে বীর যোদ্ধা ক্যাপ্টেন আফতাবুল কাদের; শহীদ হবার মধ্য দিয়ে মহালছড়ি পতন হলে প্রশিক্ষণের জন্য ভারত চলে যান।

জন্মসূত্রে মহালছড়ির পুরনো বাসিন্দা এই মুক্তিযোদ্ধা দৃঢ়তার সাথে জানান, মহালছড়ির স্বনামধন্য এই তিন ব্যক্তির উদ্যোগেই যুদ্ধকালীন জনমত সংগঠিত হয়েছে। যুদ্ধ শেষে ফিরে এসে শুনি তাঁদেরকে মাইসছড়ি বাজারের বিহারী জাগির’র নেতৃত্বে পাকিস্তানী হায়েনারা ঘর থেকে তুলে এনে খুন করেছে। এমনকি আজ পর্যন্ত সেই তিন ব্যক্তির দেহাবশেষও পাওয়া গেলোনা। অথচ, স্বাধীনরতার ৪৩ বছরের মাথায় তাঁদেরকে শহীদ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানের দাবী জানাতে হচ্ছে।

চিত্তরঞ্জন কার্বারীর সন্তান খাগড়াছড়ি সরকারী কলেজেন সাবেক অধ্যক্ষ ড. সুধীন কুমার চাকমা জানান, তিনিসহ অন্য দুই জনের স্বজনদের দাবী-দাওয়ার মুখে ২০০১ সালে মহালছড়ি উপজেলার তৎকালীন নির্বাহী অফিসার বিমল চন্দ্র দাশ উপজেলা সদরে একটি ছোট্ট স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করেন। যেখানে অন্যদের সাথে এই তিন জনের নামও খচিত হয়।

তিনি বলেন, সরকারীভাবে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় নির্মিত জেলা সদরের কেন্দ্রীয় স্মৃতি সৌধে তোলা হয়নি, তাঁদের নাম। এ বিষয়ে মহালছড়ি’র মুক্তিযোদ্ধা এবং তিন শহীদের স্বজনরাও দাবী জানিয়ে আসলেও, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে; বিষয়টি নিয়ে তাঁরা মন্ত্রণালয়ে কথা বলেছেন। তবে এ সংক্রান্ত কোন নীতিমালা প্রশাসনকে প্রদান করা হয়নি। তাই, সরকারী স্বীকৃতি পাচ্ছেন এই তিন শহীদ।

একই ধরনের ক্ষোভ আর আক্ষেপ পুটে উঠেছে, গৌরাঙ্গ মোহন দেওয়ানের ছেলে প্রীতিবিন্দু দেওয়ান এবং সব্যসাচী মহাজনের ছেলে রাজ মুকুট চাকমা’র কন্ঠে।

তাঁরা জানান, দেশ স্বাধীনের পর জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান স্বাক্ষরিত একটি করে প্রত্যেক পরিবারের উত্তরাধিকারীদের দুই হাজার টাকা চেক দেয়া হয়েছিলো।

তবে প্রশাসনের তরফ থেকে কোন সদুত্তর মেলেনি। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোঃ আব্দুল খালেক বলেন, এই বিষয়ে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে কথা বলা হয়েছে। মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে, এই সংক্রান্ত কোন নীতিমালা নেই। তাই কোন পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব হচ্ছেনা।

এদিকে ‘সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)’ জেলা কমিটির সাঃ সম্পাদক এড. নাসির উদ্দিন আহমেদ, ‘সুশাসনের জন্য প্রচারাভিযান (সুপ্র)’ জেলা শাখার সভাপতি নমিতা চাকমা বলেন, জীবিত বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং এলাকাবাসীর বক্তব্য আর তথ্য-প্রমাণ-ই সাক্ষ্য দেয় যে, চিত্তরঞ্জন কার্বারী, সব্যসাচী মহাজন এবং গৌরাঙ্গ মোহন দেওয়ান। স্বাধীনতা আর মুক্তিযুদ্ধের স্ব-পক্ষে সোচ্চার ছিলেন বলেই হত্যার শিকার হয়েছেন।

তাঁরা দাবী করেন, সরকারী নীতিমালায় কী আছে, সেটার চেয়ে জরুরী প্রশ্ন হলো; এই তিন ব্যক্তির আত্মদানের প্রতি সন্মান প্রদর্শনের জন্য নুন্যতম উদ্যোগ গ্রহন করা।

মানুষ মানুষকে ভুলে যায়, কিন্তু পিতাকে তো ভুলতে পারেন না, কোন সন্তান। আর যদি সেই পিতার মৃত্যুটি যদি হয়, গর্বের। এমন গর্বিত পিতার সন্তানরাই খুঁজে বেড়াচ্ছেন, পিতার স্বীকৃতি। যেসব পিতার মরদেহ কিংবা কবরের কোন স্মৃতিচিহ্ন-ই আর নেই তাঁদের কাছে।

সরকারের দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেবেন বলেই আশাবাদী তিন শহীদের পরিবারের।

–হিলবিডি২৪/সম্পাদনা/সিআর.

Print Friendly