পুরোদমে চলছে সেনাবাহিনীর নানামুখী উন্নয়ন কর্মকান্ড


সবুজ বনানী ঘেরা দুর্গম পাহাড়ী জনপদ সাজেক এখন আর দুর্গম নয়

জাহাঙ্গীর আলম রাজু সাজেক থেকে ফিরে

d-1hillbd24.com

সবুজ বনানী ঘেরা পাহাড়ী জনপদ সাজেক। এ পাড়ে বাংলাদেশ আর ওপাড়ে ভারত। দু’পাড়ের নয়নাবিরাম প্রকৃতির অপরুপ দৃশ্য যেনো হাতছানি দিয়ে ডাকে প্রকৃতি প্রেমিদের। শীত মৌসুমে কুয়াশায় ঢাকা সাজেকের পাহাড় দেখে মনে হয় যেনো কোনো হিমালয় পর্বত। আর বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ের চুড়ায় মেঘের লুকোচুরি খেলা মোহিত করে পর্যটকদের। তাই প্রকৃতির এই অপরুপ দৃশ্য উপভোগ করতে দুর্গম সাজেকে ছুটে আসেন দেশী বিদেশী অসংখ্য পর্যটক।

শুধু পর্যটক নয় সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও সাজেক সফর করেছেন। সফরকালে তিনি সাজেককে বাংলার দার্জিলিং হিসাবে আখ্যায়িত করে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার আগ্রহ প্রকাশ করেন। তাই রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ির দুর্গম এই পাহাড়ী জনপদে দৃষ্টিনন্দন পর্যটন কেন্দ্রসহ সাজেকের উন্নয়নে নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছে সেনাবাহিনী। পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা হলে বদলে যাবে দুর্গম সাজেকের পারিপার্শ্বিক পরিবেশ পরিস্থিতি। এমনটি মনে করছেন সাজেকে বসবাসরত সহজ সরল লুসাই ও ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের মানুষ। অতীতে যানবাহন যোগে সাকেজ যাওয়ার ছিল না কোনো ব্যবস্থা। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর ঐতিহাসিক পার্বত্য চুক্তির পর সাজেকের সাথে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাপনের উদ্যোগ নেয় সেনাবাহিনী।

d-3hillbd24.com

বর্তমানে যেকোন যানবাহন নিয়ে সহজেই যাতায়াত করা যায় সাজেকে। তাই এক সময়ের দুর্গম সাজেক এখন আর দুর্গম নয়। পর্যটক ও এলাকাবাসীর সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোর (১৯ ইসিবি) বাঘাইহাট বাজার থেকে সাজেক কংলাকপাড়া পর্যন্ত প্রায় ৩৩ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়ন কাজ ইতিমধ্যে সম্পন্ন করেছেন। এই সড়ক উন্নয়নে প্রায় ৮০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষন করতে রুইলুইপাড়া থেকে সাজেক বিওপি পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার সড়কের দু’পাশে বসানো হয়েছে নানা ডিজাইনের দৃষ্টি নন্দন টাইলস। এই সড়কে পর্যটক কিংবা এলাকাবাসী রাতের বেলায়ও যাতে নিরাপদে চলাফেরা করতে পারে সেজন্য সোলারের মাধ্যমে করা হচ্ছে আলোর ব্যবস্থা।

সাজেকের লুসাই ও ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের অসংখ্য সমস্যার মধ্যে নিত্য প্রয়োজনীয় পানীয়জলের সংকট অন্যতম। তাই এই সমস্যা দূর করতে সাজেক রুইলুই পাড়ায় ৭০ লাখ ৮৫ হাজার টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প গ্রহন করা হয়েছে বলে সেনাবাহিনী সূত্রে জানা যায়। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে নিত্য প্রয়োজনীয় পানীয়জলের সমস্যা দূর হবে বলে মনে করছেন সাজেকের বাসিন্দারা। শিক্ষাক্ষেত্রে পিছিয়েপড়া এই জনপদে একটি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও নেই মাধ্যমিক শিক্ষা লাভের কোনো সুযোগ সুবিধা। তাই একটি নিন্মমাধ্যমিক বিদ্যালয় চালু করারও উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

দুর্গম সাজেকে বসবাসরত খৃষ্টান ধর্মালম্বী লুসাই সম্প্রদায় এবং সনাতন ধর্মালম্বী ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের প্রাচীন সংস্কৃতি ও সাংস্কৃতিক স্বকীয়তাকে বিকশিত করার লক্ষ্যে রুইলুইপাড়ায় নির্মাণ করা হচ্ছে একটি কমিউনিটি সেন্টার। যেখানে থাকবে তাদের প্রাচীন সংস্কৃতি সংরক্ষন ও সাংস্কৃতিক চর্চার প্রয়োজনীয় সুযোগ সুবিধা। সাজেকবাসীর স্বাস্থ্য সেবায়ও কাজ করেছে সেনাবাহিনী। তাছাড়া রুইলুই পাড়ায় ঐতিহ্যবাহী ডিজাইনে লুসাই ও ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের কয়েকটি বসত বাড়ি নির্মানের পাশাপাশি চলছে পুরাতন বসত বাড়ির মেরামত ও সংস্কারের কাজ। আগামী ৩০ ডিসেম্বরের মধ্যে এসব উন্নয়ন প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ের কাজ শেষ হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

d-4hillbd24.com

সরেজমিন সাজেক পরিদর্শনকালে কথা হয় সাজেক কংলাক মৌজাপ্রধান (হেডম্যান) চংমিং থাংয়ার সাথে। তিনি জানান, অনেক দেড়িতে হলেও সাজেকবাসীর উন্নয়নে সেনাবাহিনী যে উদ্যোগ নিয়েছে তাতে এই এলাকার মানুষ অত্যন্ত খুশি। তবে আরও আগে থেকে যদি এধরনের উদ্যোগ নেয়া হতো তাহলে জীবন এবং জীবীকার প্রয়োজনে সাজেকের কোনো মানুষকে ভারতের মিজোরাম রাজ্যে আশ্রয় নিতে হতো না।

একমাত্র জীবীকা নির্বাহের সুযোগ সুবিধা না থাকায় সাজেকের হাজারো লুসাই পরিবার ভারতের মিজোরাম রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে বলে জানান তিনি। তিনি আরও জানান, বর্তমানে সাজেকের রুইলুই ও কংলাক পাড়ায় লুসাই ত্রিপুরা মিলে দেড় শতাধীক পরিবার মাতৃভূমির মায়া মমতা ছাড়তে পারেনি বলেই অনেক অভাব অনটনের মাঝেও তারা সাজেকের মাটি আকড়ে ধরে আছেন। একমাত্র জুমচাষের ওপর নির্ভরশীল এই পরিবারগুলো এখন আর জুমের ওপর নির্ভর করতে পারছে না। কারন জুমে আগের মত আর ফসল উৎপাদন হয় না। তাই পর্যটন শিল্পের উন্নয়নের পাশাপাশি এই এলাকার মানুষের জীবন এবং জীবীকার প্রয়োজনে মিশ্র ফলের বাগান গড়ে তোলতে প্রয়োজনীয় আর্থিক সহযোগিতা প্রদানের দাবী জানান তিনি।

সাজেক রুইলুই মৌজা প্রধান (হেডম্যান) লাল থাংয়া লুসাই জানান, যুগ যুগ ধরে অবহেলীত পাহাড়ী জনপদ সাজেক। দেশ স্বাধীন হওয়ার ৪২ বছর পর সাজেকবাসীর উন্নয়নে উদ্যোগ নিয়েছে সেনাবাহিনী। তাই সাজেকবাসীর পক্ষ থেকে সেনাবাহিনীর এই উদ্যোগকে আমি স্বাগত জানাই।

তিনি জানান, সেনাবাহিনীর এই উদ্যোগ তখনই সফল হবে যখন আর্থিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষা ও শান্তিসহ দুর্গম সাজেকবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তিতা পরিপূর্ণ হবে। সেনাবাহিনীর এই উদ্যোগ সফল হলে সাজেকবাসীর ভাগ্যের চাকা ঘুরে দাড়াবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক লাল থাংকিমা লুসাই জানান, সাজেক এলাকায় চাষাবাদযোগ্য সমতল কোনো ভূমি নেই। তাই সেই প্রাচীনকাল থেকেই সাজেকের মানুষ জুমচাষ আর কমলা চাষ করেই জীবীকা নির্বাহ করে আসছে। তবে এখন আর আগের মত জুমের ফসল কিংবা কমলা উৎপাদন না হওয়ায় এই এলাকার লোকজন পরিবার পরিজন নিয়ে পড়েছেন বিপাকে। তাই পর্যটনসহ নানা প্রকার উন্নয়ন কর্মকান্ডের পাশাপাশি সরকারী অর্থায়নে পাহাড়ে মিশ্র ফল বাগান কিংবা যেকোন বিকল্প চাষাবাদের ব্যবস্থা করা হলে সাজেকবাসীর এগিয়ে যাওয়ার পথ সুগম হবে জানান তিনি।

সাজেক মিশনারী স্কুলের শিক্ষক জেমস জানান, হতাশাগ্রস্ত সাজেকবাসীর মাঝে আশার প্রদীপ জ্বালিয়েছে সেনাবাহিনী। সেনাবাহিনী কতৃক গৃহীত পর্যটনসহ নানা প্রকার উন্নয়ন কর্মকান্ড সাজেকবাসীর ভাগ্য পরিবর্তনে সহায়ক ভূমিকা রাখবে এতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। তাই পরিবর্তনের এই ধারা অব্যাহত রাখতে সাজেকবাসীর মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করার দাবী জানান তিনি।

বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুমন চৌধুরী জানান, সাজেককে ঘিরে সেনাবাহিনী যে উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহন করেছে তা বাঘাইছড়িবাসীর জন্যে শুভ সংবাদ। তাই বাঘাইছড়িবাসীর পক্ষ থেকে আমি সেনাবাহিনীর এই উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। বাঘাইছড়ি উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান দীপ্তিমান চাকমা জানান, পাহাড়ের মানুষের স্বার্থে আমরা যেকোন উন্নয়ন কর্মকান্ডকেই স্বাগত জানাই। উন্নয়নের পাশাপাশি পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় অবিলম্বে পার্বত্য শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন বলেও জানান তিনি।

দীঘিনালা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হাজী মোঃ কাশেম জানান, সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাপনের পর পর্যটনসহ সাজেকবাসীর উন্নয়নে সেনাবাহিনী যে পদক্ষেপ নিয়েছে তা নিংসন্দেহে প্রশংসার দাবীদার। পার্বত্য শান্তিচুক্তির পর পাহাড়ের মানুষের শান্তি সম্প্রীতি ও উন্নয়নের লক্ষ্যে যে পদযাত্রা শুরু হয়েছে তা সফলতার দ্বারপ্রান্তে পৌছে দিতে সেনাবাহিনীর এই উদ্যোগ সহায়ক ভূমিকা রাখবে বলে জানান তিনি।

খাগড়াছড়ি রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কাজী শামশুল ইসলাম পিএসসি জানান, সূর্য্যরে আলোয় প্রথম আলোকিত হয় দুর্গম পাহাড়ী জনপদ সাজেক। তাই উন্নয়নের আলো থেকে কেনো পিছিয়ে থাকবে সাজেকের মানুষ। আমরা পিছিয়েপড়া এই জনপদের মানুষকে এগিয়ে নেয়ার পদক্ষেপ নিয়েছি। সাজেককে ঘিরে যেসব উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহন করা হয়েছে তা সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে সাজেক নিয়ে এই এলাকার মানুষ গর্ব করবে বলে জানান তিনি।

d-2hillbd24.com

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম অঞ্চলের এরিয়া কমান্ডার ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল সাব্বির আহাম্মদ এনডিসি, পিএসসি জানান, সাজেক সর্বক্ষেত্রে সম্ভাবনাময় একটি অঞ্চল। তাই এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে পর্যটনসহ নানা প্রকার উন্নয়ন কর্মকান্ডের মাধ্যমে আমরা সাজেককে আরও নান্দনিক ও বর্ণিল সাজে সাজাতে চাই।

তিনি আরও বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তির ফলে পাহাড়ের মানুষের শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়নের পথ সুগম হয়েছে। এখন পাহাড়ের বসবাসরত মানুষদের এগিয়ে যাওয়ার সময়। তাই অতীতের কোনো সমস্যা যাতে শান্তি প্রিয় পাহাড়বাসীকে এগিয়ে যাওয়ার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে না পারে সেদিকে পাহাড়ী বাঙ্গালী সবাইকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। তিনি বলেন, অতীতের কোনো সমস্যার জন্য বর্তমান দায়ী হতে পারে না। তাই অতীতকে ঘিরে যদি এই এই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে কোনো প্রকার মতভেদ কিংবা সমস্যা থাকে তা আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান করতে হবে। কারন যেকোন সমস্যা সমাধানে আলোচনার কোনো বিকল্প নেই।

-হিলবিডি২৪/সম্পাদনা/সিআর.

Print Friendly