শুভাশীষ চাকমার সাক্ষাতকার-পাহাড়ে মাতৃভাষা সুরক্ষায়  স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র তৈরীর পরিকল্পনা রয়েছে

খাগড়াছড়ি প্রতিবেদক, হিলবিডিটোয়েন্টিফোর ডটকম

Picture2

শুভাশীষ চাকমা, এখন চল্লিশোর্ধ্ব তরুণ। জীবিকার পেশা কৃষি জমিদারী হলেও সেই ছাত্রজীবন থেকেই মনে গেঁথে আছে জাতিগত সংঘাত, উদ্বাস্তু ফেরারী জীবনের ক্ষত আর ঘরপোড়া সময়ের দুঃখ জাগানিয়া মুর্হুতগুলো। শিক্ষিত ও সম্ভ্রান্ত পরিবারের উত্তারাধিকারী হলেও তথাকথিত আভিজাত্যকে পেছনে ফেলে জীবনের সাধ্য ও শ্রম দিয়ে নির্মাণ করে চলেছেন, নিরন্তর ছবি আর স্বল্প দৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের জগৎ।

পাহাড়ের সংগ্রামী নারী কল্পনা চাকমার পোর্ট্রেট, নব্বইয়ের দশকে বিদ্যুতের দাবীতে প্রাণহারা নীতিশ চাকমার ছবি, পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত দূর্গম জনপদের জন-জীবনের শ্রমচিত্র, জাতিগত সংঘাত ও ঘরপোড়ার দৃশ্যসহ অসংখ্য সাহসী ছবি তিনি তুলেছেন। দক্ষিণ এশিয়ার বিখ্যাত ‘দৃক’ গ্যালারী এবং ‘ছবিমেলা’-তে তাঁর এসব ছবি স্থান পেয়েছে।

শুভাশীষ চাকমার মতে, যে কোন জাতি-গোষ্ঠির শিক্ষা-সংস্কৃতি-ভাষা-কৃষ্টি-ঐতিহ্য’র সুরক্ষা ও বিকাশে সৃজনশীলতার কোন বিকল্প নেই। আর বংশ পরম্পরায় পরিপূর্নভাবে তা বয়ে নিয়ে যেতে পারে একমাত্র চলচ্চিত্রই।

তিনি জানান, নব্বইয়ের দশক থেকেই ফটোগ্রাফীতে মনোযোগী হন। ১৯৮৯ সালে ৪ মে রাঙামাটির লংগদুতে ইতিহাসের জঘন্যতম একটি জাতিগত হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে সরব হয়ে উঠে তরুণ ও ছাত্র সমাজ। ১৯৮৯ সালের ২০ মে রাঙামাটি থেকে তাঁরা দলবদ্ধভাবে ঢাকায় যাত্রা করেন। ঢাকায় অনুষ্ঠিত পাহাড়ী শিক্ষার্থীদের মৌন মিছিলটিকে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি নতুন মাইলফলক হিসেবে দেখা হয়। সেই ক্ষোভ আর বেদনা তার মনকে শাণিত করলেও হাত তখনো পরিপক্ক হয়ে উঠেনি। ১৯৯৩-৯৪ সালে মোহাম্মদপুর কেন্দ্রীয় কলেজে পড়ার সময় ফটোগ্রাফীর ঝোঁকটা ভালো করেই পেয়ে বসে।

তিনি আরও জানান, ফটোগ্রাফীর পাশাপাশি ১৯৯৪ সালে ‘চলচ্চিত্রম ফিল্ম সোসাইটি’র সাথে যুক্ত হয়ে সাহচর্য্য লাভ করেন খ্যাতিমান চলচ্চিত্র নির্মাতা মোরশেদুল ইসলামের। মুলতঃ তাঁর সাথে সহকর্মী হিসেবে যুক্ত হয়েই স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র সৃষ্টির নেশায় পেয়ে বসেন তিনি। তারপর তিনি ডকুমেন্টারী তৈরীতে হাত দেন।

শুভাশীষ চাকমার এরমধ্যে বান্দরবান জেলায় বসবাসরত এবং সংখ্যায় পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম জাতিগোষ্ঠি ‘খুমী’দের তৈরী ‘খুমীস্ লাইফ’ এবং খিয়াংদের নিয়ে তৈরী আরো একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র বোদ্ধামহলে বেশ প্রশংসা কুড়িয়েছে। এ দুটি চলচ্চিত্র প্রচারিত হয়েছে বেসরকারী টেলিভিশন ‘একাত্তর’ এবং ‘এটিএন বাংলা’য়।

তিনি বলেন, জাতিসত্ত্বার পরিচিতি, সংস্কৃতি’র বিপন্নতার ক্ষেত্রে ভাষাও একটা বড়ো ফ্যাক্টর। খুমীদের সিনেমাটোগ্রাফীতে তাঁদের মাতৃভাষার একটা কঠিন সংবেদনশীল আবহ ঘুরেফিরে উঠে এসেছে। শিক্ষককের বাংলা বয়ান এবং শিক্ষার্থীর দুর্বোধ্যতার সেই দৃশ্য পার্বত্য চট্টগ্রামে এখনো বিদ্যমান।

তিনি জানান, তাঁর শ্রমসাধ্য এই দুটি ব্যতিক্রমী চলচ্চিত্র সৃষ্টির পেছনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মেঘনা গুহ ঠাকুরতা এবং সৃজনশীল বেসরকারী প্রতিষ্ঠান ‘রিসার্চ ইনিশিয়েটিভ বাংলাদেশ (রিইব)’র অনুপ্রেরণা উল্লেখযোগ্য। তাছাড়া মুলধারার বিনোদনপূর্ন চলচ্চিত্রের বিপরীতে অন্ত্যজ শ্রেণীর প্রতিনিধিত্বের পথটা প্রশ্বস্ত করার ক্ষেত্রে সহযোগিতা হাত বাড়িয়েছে, বাংলাদেশ শর্ট ফিল্ম ফোরাম এবং ‘বাংলাদেশ প্রামাণ্য পর্ষদ’।

‘খুমীস্ লাইফ’ তৈরীর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে শুভাশীষ চাকমা বলেন, নব্বই দশকের দিকে ঢাকাতে পড়ার সময় বন্ধুদের নিয়ে বেড়াতে যান বান্দরবানের বগালেক এলাকায়। তখনকার স্কুল পড়–য়া লেলুং খুমী ছিলো দলের গাইড।

পার্বত্য চট্টগ্রামের ১১টি জাতিস্বত্তার মধ্যে বিপন্নতম হিসেবে এই জাতি-গোষ্ঠির প্রতি ভ্রমণকারী দলটির বেশ কৌতুহল ছিল। আর সরেজমিনে সেই বিপন্নতার অভিজ্ঞতা, নিজস্ব চেতনা এবং পারিবারিক উত্তরাধিকার থেকেই ফিল্ম দুটোতে মনোনিবেশ করেছেন বলেন জানান শুভাশীষ।

আগের চেয়ে তুলনামুলকভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামে চলচ্চিত্র,প্রামাণ্যচিত্র তৈরী এবং সিরিয়াস ফটোগ্রাফী কমে যাবার প্রবণতাকে  সময়ের বন্ধ্যাত্ব বলেই তিনি মনে করেন। কালের প্রয়োজনেই সৃষ্টি অর্নিবার্য্য হয়ে উঠে। রাজনৈতিক বাস্তবতা-সরকারী-বেসরকারী পৃষ্ঠপোষকতা এবং মননশীল ভোক্তার ঘাটতি যেসব এলাকাকে খুঁড়ে খুঁড়ে খাচ্ছে; পার্বত্য চট্টগ্রাম এখন তেমনিই এক জনপদ।

তিনি বলেন, মুল্যবোধের সংকটে পড়ে সবাই এখন প্রেরণাশুণ্য।সৃষ্টির জন্য শ্রম-সাধনাই জরুরী, অর্জন নৈর্ব্যক্তিক। কালের নিক্তিতে বিন্দু পরিমাণ টিকে থাকার মাঝেই শিল্পীর স্বার্থকতা।

উল্লেখ্য, শুভাশীষ চাকমা, স্ত্রী ও একমাত্র শিশুকন্যাকে নিয়ে খাগড়াছড়ি জেলা শহরের অদূরে বসবাস করেন। বর্তমানে তিনি পাহাড়ের বিকাশমান কৃষি প্রযুক্তি, দ্রুত পাল্টে যাওয়া কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থাপনা এবং সেই বাস্তবতায় পাহাড়ী জনগোষ্ঠির প্রতিযোগিতাপূর্ন জীবন সংগ্রাম, অনুন্নয়নের উন্নয়ন, বিপণন বৈষম্যসহ সুক্ষ্মচোখে দেখা যায়না, এমন সব বিষয় নিয়ে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র এবং প্রামাণ্যচিত্র তৈরী করে চলেছেন। এরমধ্যে বেশক’টি আলোর মুখও দেখেছে।

ভবিষ্যতে তার পরিকল্পনা কথা তুরে তিনি বলেন, পাহাড়ের মাতৃভাষা সুরক্ষার ক্ষেত্রে চেতনা, মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রয়োগিত কৌশল নিয়ে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র তৈরীর কথা ভাবছেন। কারণ, খুব দ্রুতই পাহাড়ের অধিকাংশ ভাষা ও সংস্কৃতি বিকৃত থেকে বিলুপ্তের পথে পা বাড়াচ্ছে। এই অবস্থা চলতে থাকলে বাংলাদেশ তার হাজার বছরের জাতি-ভাষা ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য হারিয়ে ফেলবে।

এ ক্ষেত্রে সরকারের বিশেষ পদক্ষেপ বড় আকারের ভূমিকা রাখবে বলে  আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

–হিলবিডি২৪/সম্পাদনা/সিআর.

Print Friendly