লক্ষ্মীছড়িতে এক আতংকের নাম সুরুজ বাহিনী

নিজস্ব প্রতিবেদক,খাগড়াছড়ি, হিলবিডিটোয়েন্টিফোর ডটকম

Picture9

খাগড়াছড়ির লক্ষ্মীছড়ি উপজেলায় এক আতংকের নাম হচ্ছে সুরুজ বাহিনী। এ সুরুজ বাহিনী অপকর্ম ছাড়াও  উজাড় দিচ্ছে রিজার্ভ ফরেষ্টসহ ব্যক্তি মালিকানাধীন পাহাড়ী-বাঙ্গালীর সৃজিত বাগান বাগিচা। এ বাহিনীর তান্ডবে পুরো উপজেলাবাসী আতংকে দিন কাটালেও রহস্যজনক কারনে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন নির্বিকার।

জানা গেছে, লক্ষীছড়ি উপজেলাবাসীদের গরুর গোয়াল থেকে গরু ছিনিয়ে জবাই করে খেয়ে ফেলাসহ এমন কোন অপকর্ম নেই এ বাহিনীর সদস্যরা করছে না ! এ সুরুজ বাহিনী সরকারী বনাঞ্চল থেকে পুরো উপজেলায় ব্যক্তিমালিকানাধীন বাগানের উপর চালাচ্ছে সাঁড়াশী তান্ডব। এ তান্ডবে বাদ পড়েনি উপজেলার লক্ষ্মীছড়ি ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ড ডিপি পাড়ার স্থানীয় তারানা মোহন চাক্মা, সুবল চাক্মা ও বিরেন্দ্র চাক্মা এবং লাইলী বেগমের বাগান। সর্বশেষ দৈনিক জনকণ্ঠের রাঙামাটি প্রতিনিধি সাংবাদিক মোহাম্মদ আলী গংয়ের ২০ একর জায়গার উপর ২৫ বছরের পুরনো প্রায় সৃজিত কর্তনযোগ্য প্রায় ১০ হাজার সেগুন, গর্জনসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ।

ক্ষতিগ্রস্থরা অভিযোগ করেছেন, টানা হরতাল ও অবরোধের সুযোগে হঠাৎ গত ৩ ফেব্রুয়ারি (মঙ্গলবার) এ বাহিনীর প্রধান মহিষকাটা এলাকার সুরুজ মিয়া, মোঃ সফিকুল ইসলাম, ফটিকছড়ি দ: পাইন্দং এলাকার মোঃ জাহেদ ইসলাম চৌধুরী, মোঃ আমির আজমসহ এলাকার মোশারফ, জাকিরসহ অজ্ঞাত ১০থেকে ১৫জনের একটি সন্ত্রাসী দল দেশীয় অস্ত্রে শস্ত্রে সজ্জিত হয়ে বাগানের প্রায় ১০ হাজার সেগুন ও বিভিন্ন প্রজাতির ছোট-বড় সব গাছ কেটে ফেলেছে। শুধু তাই নয়, বাগানের মধ্যে রাস্তা তৈরী করে জীপ গাড়ী দিয়ে টানা ৯দিন ধরে গাছ পরিবহণ করে নিয়ে যায় এবং গাছ ও গাছের লাকড়ী গুলো  নিকটস্থ ফটিকছড়ির একটি ব্রিকফিল্ডে বিক্রি করে, বাদ পড়েনি ফটিকছড়ি কাঞ্চন নগরের সীমানার রিজার্ভ ফরেষ্টের গাছও। ভয়ে ও সুরুজ বাহিনীর আতংকে কেউ স্থানীয় প্রশাসনকে অবহিত করেননি বলে জানান, নি:স্ব হওয়া এসব বাগান  মালিকরা।

সাংবাদিক মো. আলী বলেন, কাপ্তাই বাঁধের ক্ষতিগ্রস্থ প্রজা হিসাবে ১৯৬০ সালে তার পিতা উপজেলা ডিপি পাড়ায় বসতি স্থাপন করেন এবং ২০ একর জায়গার উপর সৃজিত বাগানটি তার অনুপস্থিতিতে সুরুজ বাহিনী কেটে নেওয়ায় তিনি আজ নি:স্ব হয়ে পড়েছেন। সাংবাদিকতা করে কর্মজীবনের একমাত্র অর্জিত বাগানের অর্ধ কোটি টাকার গাছ হারিয়ে তিনি লক্ষ্মীছড়ি থানায় গতকাল (সোমবার) এ বাহিনীর প্রধান সুরুজ মিয়াকে প্রধান আসামী করে লিখিত এজাহার দাখিল করলেও পুলিশ এখনও কাউকে গ্রেফতার করেনি।

এছাড়া তিনি প্রতিকার চেয়ে বিষয়টি লিখিত ভাবে খাগড়াছড়ি জেলার সংসদ সদস্য ও লক্ষীছড়ি উপজেলা নির্বাহী অফিসারকেও জানিয়েছেন। অভিযোগপত্র পেয়ে জেলার সংসদ সদস্য কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখার জন্য পুলিশ সুপার খাগড়াছড়ির দৃষ্টি আকর্ষন করেছেন।

খাগড়াছড়ি পুলিশ সুপার শেখ মো: মিজানুর রহমান জানান, বনজ সম্পদ ধবংসকারীদের যে কোন মূল্যে আইনের আওতায় আনা হবে। ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে লক্ষ্মীছড়ি থানার অফিসার ইনচার্জ রতন কুমার দাশ গুপ্ত জানান, বিষয়টি তন্ত করে দেখা হচ্ছে।

এদিকে, লক্ষ্মীছড়িতে রিজার্ভ ফরেষ্টসহ ব্যক্তিমালিকানাধীন বন ধবংসের বিষয়ে বক্তব্য নিতে গত ৯ ফেব্রুয়ারী দুপুরে লক্ষ্মীছড়ি  বন বিভাগ কেন্দ্রে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মামুনুর রশিদ মীরের কার্যালয়ে গিয়ে দেখা গেল, কার্যালয়ে তালা ঝুলছে। সূত্র যায় দীর্ঘ একমাসেরও বেশী সময় ধরে কার্যালয়ে অনুপস্থিত তিনি। এমনটা নুতনও নয়, প্রতিমাসেই বেতন উত্তোলনের জন্য একবার অফিস আসেন ঐ বন কর্মকর্তা।

তবে মামুনুর রশিদ মীরের সাথে সেল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি অসুস্থ্য ও ঢাকা আসেন বলে জানান। প্রায় এক ঘন্টার পর কার্যালয়ে পাওয়া গেল বন প্রহরী মো: শফিকুল ইসলামকে।

বন প্রহরী শফিকুল ইসলাম  জানান, এ চক্রটি স্থানীয়দের বাগানের পাশাপাশি লক্ষ্মীছড়ি’র প্রায় ৭০ একর সরকারি বাগানের গাছও কেটে সাবার করেছে। তিনি বলেন, আমরা নিজেরাও ঐ চক্রটির ভয়ে তটস্থ। মাত্র তিনজন লোকবল নিয়ে চোরাকারবারীদের প্রতিরোধ করা আমাদের পক্ষে কোনভাবেই সম্ভব না। বাধা দিতে গিয়ে কয়েকবার পাচারকারীদের হামলায় পালিয়ে আসতে হয়েছে বলে তিনি জানান।

এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড মেম্বার বন কুমার চাক্মা ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন,  সুরুজ বাহিনীর প্রধান বরিশাল এলাকার সর্বহারা দলের সদস্য ছিল বলে এলাকায় জনশ্রুতি রয়েছে। এ বাহিনী খুবই ভয়ানক। তাদের তান্ডবে পুরো উপজেলার বাগান মালিকরা আতংকিত। ইচ্ছা থাকলেও তাদের বিরুদ্ধে কিছুই করা যাচ্ছে না।

লক্ষীছড়ি উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. শওকত ওসমান বলেন, জায়গাটি ফটিকছড়ি, লক্ষীছড়ি ও মানিকছড়ি উপজেলার ত্রি-সীমানার মধ্যবর্তী স্থানে হওয়ায় এলাকাটি সন্ত্রাসীদের বিচরণ ক্ষেত্রে পরিনত হয়েছে অভিযোগ রয়েছে। সন্ত্রাসীরা সন্ত্রাসী কর্মকান্ড ঘটিয়ে সুযোগ বুঝে এক উপজেলা থেকে অপর উপজেলায় গিয়ে আশ্রয় নেয়। তিনি  আরও জানান, এদের অনেকের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে।এরা মূলত: পলাতক রয়েছে। তর পরও বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। বিষয়টি লক্ষীছড়ি  জোন  কমান্ডারকে জানানো হয়েছে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে জানান, অচিরেই সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় আনা হবে।

–হিলবিডি২৪/সম্পাদনা/সিআর.

Print Friendly