রাঙামাটিতে দুই তালুকদারের মধ্যে হবে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই

বিশেষ রিপোর্টার, হিলবিডিটোয়েন্টিফোর ডটকম 

okhillbd24.com

আগামী ৫ জানুয়ারী অনুষ্ঠিতব্য দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাঙামাটির ২৯৯ নং আসনে প্রতিদ্বন্ধী ৬ প্রাথীর মধ্যে আওয়ামীলীগের মনোনীত প্রার্থী দীপংকর তালুকদার(নৌকা) ও স্বতন্ত্র প্রার্থী উষাতন তালুকদারের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। ইতোমধ্যে নির্বাচনী বিধিমোতাবেক দুই তালুকদার প্রচার-প্রচারনা শেষ করেছেন এবং উভয় প্রার্থী জয়যুক্ত হওয়ার আশাবাদী।

এদিকে নির্বাচনী প্রচারনা শেষ হওয়ার এক দিন আগে দুই তালুকদার পৃথক পৃথক সংবাদ সন্মেলনে নির্বাচনী পোস্টার, প্রচারনায় বাধা ও হুমকির অভিযোগ এবং ভোট কারচুপির সম্ভাবনার আশংকা প্রকাশ করেছেন। এছাড়া ভোটাররা যাতে নিবিঘ্নে ভোট কেন্দ্রে গিয়ে ভোট প্রয়োগ করতে পারেন সেজন্য প্রতিনিটি ভোট কেন্দ্রে নিরাপত্তা জোরদার এবং অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন প্রশাসনের কছে।

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাঙামাটির ২৯৯নং আসনে এবার বিএনপি তথা ১৮ দলীয় জোট বাদে দুই জাতীয় রাজনৈতিক দল আওয়ামীলীগ ও জাতীয় পার্টি এবং চার আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল থেকে মনোনীত প্রার্থী প্রতিদ্বন্ধিতা করছেন। প্রতিদ্বন্ধি প্রার্থীরা হলেন আওয়ামীলীগের মনোনীত প্রার্থী ও বর্তমান পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষযক মন্ত্রনালয়ের প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদার(নৌকা) ও জাতীয় পার্টির মনোনীত প্রার্থী ডা. রুপম দেওয়ান(লাঙ্গল)। অপর চার স্বতন্ত্র প্রার্থী হলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির নেতা উষাতন তালুকদার(হাতি), ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের(ইউপিডিএফ) নেতা সচিব চাকমা(উড়োজাহাজ),এমএন লারমা সমর্থিত পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির প্রধান সুধাসিন্ধু খীসা(বই) ও পার্বত্য সম অধিকার আন্দোলন নেতা এ্যাডভোকেট আবছার আলী(আনারস)।

নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট নির্বাচন বর্জন করায় দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন সারাদেশে নির্বাচন জমে না উঠলেও রাঙামাটির চিত্রটা একটা ভিন্ন। তাই প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচারনা বেশ জমে উঠেছিল। প্রার্থীদের পোষ্টারে পোষ্টারে ছেয়ে গেছে। ইতোমধ্যে রাঙামাটি শহরের প্রার্থীদের পোষ্টারে পোষ্টারে ছেয়ে গেছে। পাশাপাশি চলছে প্রতিদ্বন্ধি প্রার্থীদের যে যার পরে প্রচারনা অংশ হিসেবে মাইকিং। তবে রাঙামাটি শহরের পোস্টারের মধ্যে দীপংকর তালুকদার, উষাতন তালুকদারের পোষ্টারের ছেয়ে যাওয়ার পাশাপাশি সমানতালে চলছে মাইকিংও। শহরের কিছু কিছু স্থানে অন্য বই প্রতীক সুধাসিন্ধু খীসা ও আনারস প্রতীক আবছার আলীর পোষ্টারও চোখে পড়ছে। অপর দুই প্রার্থী সচীব চাকমা ও ডা. রুপম দেওয়ানের কোন পোস্টার আজও পর্ষন্ত চোখে পড়েনি। যদিওবা রুপম দেওয়ান দাবি তিনি মনোনয়ন প্রত্যাহারের জন্য আবেদন করলেও তার মনোনয়পত্র প্রত্যাহার করা হয়নি। তাছাড়া কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত অনুাযায়ী নির্বাচনে অংশ না নেয়ায় তিনি নির্বাচনী প্রচারনায়ও অংশ নিচ্ছেন না।

অপর স্বতন্ত্র প্রার্থী ও ইউপিডিএফ নেতা সচিব চাকমা রাঙামাটি আসনে প্রতিদ্বন্ধিতায় গ্রহন করলেও তার পোষ্টার ও প্রচারনা দেখা যায়নি। ইউপিডিএফের সহযোগী সংগঠন পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় সাধারন সম্পাদক বিলাস চাকমা জানিয়েছেন,সুধাসিন্ধু খীসাকে সমর্থন দিয়েছে ইউপিডিএফ। নির্বাচনী প্রচারনায় তৃতীয় স্থানে থাকা সুধাসিন্ধু খীসা জেলার কয়েকটি উপজেলায় প্রতিশ্রুতি দিয়ে গনসংযোগ ও প্রচারনা শেষ করেছেন। আরেক স্বতন্ত্র প্রার্থী এ্যাডভোকেট আবছার আলী পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত সকল সম্প্রদায়ের সাংবিধানিক অধিকার ও অস্তিত্ব রক্ষায় আনারস মার্কার পক্ষের ভোট চেয়ে নির্বাচনী প্রচারনা শেষ করেছেন।

এদিকে রাঙামাটি আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে দীপংকর তালুকদার(নৌকা) ও উষাতন তালুকদার(হাতি)-এর মধ্যে। ইতোমধ্যে ভোটারদের নানান প্রতিশ্রুতি দিয়ে দুই তালুকদার উপজেলা, ইউনিয়ন, গ্রাম ও ওয়ার্ড-এর প্রচার-প্রচারনা শেষ করেছেন। এখন ভোটের অপেক্ষার পালা। তবে এবার নির্বাচনে দীপংকর তালুকদারকে জয়ী হতে বেশ বেগ পেতে হবে। গত ৫ বছরে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সম্পাদিত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির যথাযথ বাস্তবায়ন না করা, সংবিধানে পঞ্চদশ সংশোধনীতে পাহাড়ীদের আদিবাসী স্বীকৃতি না দিয়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিসত্বা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়াসহ কয়েকটি কারণে পাহাড়ীদের মাঝে ক্ষোভ রয়েছে। তাই এইসব সুযেগকে কাজে লাগাতে পারেন উষাতন তালুকদার। ইতোমধ্যে হাতির প্রতীক উষাতন তালুকদার চট্টগ্রামে স্থায়ী শান্তি, সুষম উন্নয়ন ও পার্বত্য চুক্তি জোরালো বাস্তবায়ন উদ্যোগসহ দশ দফা নির্বাচনী ইসতেহার প্রকাশ করেছেন। উষাতন তালুকদার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যারা পার্বত্যাঞ্চলের বাসিন্দা এবং সাত্যিকার অর্থে এ অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা চান তারা অবশ্যই তাকে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করে জাতীয় সংসদে পাঠাবেন। তবে দীপংকর তালুকদার এবার নির্বাচনী ইসতেহার প্রকাশ না করলেও তার নির্বাচনী প্রচারনায় অসম্প্রদায়িক চেতনায় দেশ গড়া, অসমাপ্ত উন্নয়ন কাজ সমাপ্ত করা এবং উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য নৌকা মার্কায় ভোট চেয়েছেন।

এবার নির্বাচনী মেরুকরনে প্রধান বিরোধীদল বিএনপি নির্বাচনে অংশ না নিলেও বিএনপির ভোট নিয়ে নানা জল্পনা কল্পনা চলছে। বিএনপি চেয়ারপার্সন নেতা কর্মীসহ সকলকে ভোট কেন্দ্রে যেতে বারন করলেও পাহাড়ীদের একটি অংশ দীপংকর তালুকদারকে ঠেকাতে হাতি মার্কায় ভোট দেয়ার গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। তবে জেলা বিএনপির দীপেন দেওয়ান জানিয়েছেন,দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার আহবানে আমরা ভোট কেন্দ্রে যাবো না এবং আমরা একদলীয় নির্বাচন প্রতিহত করতে জনগনকে ভোট কেন্দ্রে না যাবার আহবান জানাচ্ছি।

এদিকে প্রচারনার শেষ দিনে বৃহস্পতিবার(২ জানুয়ারী) এ আসনের অন্যতম দুই প্রতিদ্বন্ধি প্রার্থী পৃথক পৃথকভাবে র্সবাদ সন্মেলন করেছেন। শহরের হ্যাপী মোড়স্থ প্রধান নির্বাচনী কার্যালয়ে আওয়ামীলীগের প্রার্থী ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদার অভিযোগ করেছেন প্রতিদ্বন্ধি প্রার্থীর লোকজনেরা রাঙামাটির বিভিন্ন উপজেলায় তার নৌকা সমর্থক ও নির্বাচনী প্রচারনা কাজে জড়িতদের হুমকি ও নির্বাচনী পোষ্টার ছিড়ে ফেলে প্রচারণা কাজে বাধা সৃষ্টি করেছে।

তিনি কোন সংগঠনের নাম উল্লেখ না করে অভিযোগ করে আরও বলেন, প্রতিদ্বন্ধি প্রার্থী লোকজনেরা রাঙামাটি সদর,জুড়াছড়ি, বরকল, রাজস্থলী, বাঘাইছড়ি, কাউখালী কাপ্তাইসহ দশটি উপজেলায় তার নৌকা মার্কা সমর্থক ও নির্বাচনী কাজে জড়িতদের হুমকি ও বাধা দিয়েছে। এ ব্যাপারে প্রধান নির্বাচন কমিশন, জেলা নির্বাচন কার্যালয়, পুলিশকে অবগত করেছি। ব্যবস্থা নেয়ার দায়িত্ব প্রশাসনের। তিনি রাঙামাটিতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পরিবেশ অুন্ন রাখা এবং প্রতিটি ভোট কেন্দ্রে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করে ভোট গ্রহন সুষ্ঠু ভাবে সম্পন্ন করতে প্রশাসনের প্রতি আহবান জানান।

অপরদিকে স্বতন্ত্র প্রার্থী উষাতন তালুকদার আগামী ৫ জানুয়ারী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাঙামাটির ২৯৯ নং আসনের যে কোন এক প্রার্থীর প থেকে ভোট কারচুপির সম্ভাবনা রয়েছে বলে আশংকা প্রকাশ করেছেন। তিনি অভিযোগ বলেছেন, প্রতিদ্বন্ধি প্রার্থীর লোকজনেরা জেলার বিভিন্ন স্থানে তার( হাতি) সমর্থকদের নির্বাচনী প্রচারনা বাধা ও পোষ্টার ছিড়ে দিয়েছে। এমনকি নিরাপত্তাহীনতার কারনে নানিয়ারচর ও কাউখালী উপজেলার কয়েকটি স্থানে নির্বাচনী প্রচারনা চালাতে পারেননি। নির্বাচনে ভোটারা যাতে নিরাপদে নিবিঘেœ ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন সে জন্য রাঙামাটি আসনের প্রতিটি ভোট কেন্দ্রে যথাযথ নিরাপত্তার ব্যবস্থা এবং শান্তিপুর্ন ও অবাধ নিরপে নির্বাচনের জন্য তিনি দাবি জানান।

তিনি আরও বলেন,আওয়ামীলীগ প্রার্থী দীপংকর তালুকদার বিভিন্ন নির্বাচনী জনসভায় আমার ব্যক্তিগত চরিত্র হনন করে যে বক্তব্যে দিয়েছেন তা নির্বাচনীর স্পষ্ট আচরণ বিধি লংঘন।

তিনি বলেছেন, নির্বাচনী প্রচারনাকালে পাহাড়ী-বাঙালীর অফুরন্ত সমর্থন পেয়েছেন। তিনি নির্বাচিত হলে অসাম্প্রদায়িক চেতনা নিয়ে পাহাড়ী-বাঙালীর সকল সম্প্রদায়কে সাথে নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে পাহাড়ে সুষম উন্নয়নের আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।

উল্লেখ্য,এবার দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাঙামাটি আসনে মোট ভোটার হচ্ছে ৩ লাখ ৭১ হাজার ৩৪৮ জন(পুরুষ-১৯৮৬৮৩ ও মহিলা-১ ৭২৬৬৫)।

নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি মাঠে না থাকায় এবার দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনের ৬জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্ধিতায় অবতীর্ণ হলেও মূলত লড়াই হবে দুই প্রার্থী দীপংকর তালুকদার ও উষাতন তালুকদারের মধ্যে। দুই তালুকদার বিজয়ী হওয়ার জন্য ভোট যুদ্ধের ময়দানে সমানে সমানে প্রচারনা চালিয়েছেন। তাই এই ভোট যুদ্ধে কে শেষ বিজয়ের হাসিটি হাসবেন তা আগামী ৫ জানুয়ারী পর্ষন্ত সবাইকে অপেক্ষা করতে হবে।
–হিলবিডি২৪/সম্পাদনা/সিআর.

Print Friendly