মরু অঞ্চলের খেজুর দেশের মাটিতে উৎপাদনে সফল হয়েছেন কাপ্তাইয়ের কৃষি বিজ্ঞানীরা

নজরুল ইসলাম লাভলু, কাপ্তাই,হিলবিডি টোয়েন্টিফোর ডটকম 

Dat 02_DMEABS

সৌদি আরবের মরুভূমি অঞ্চলের খেজুর উৎপাদনে সফল হয়েছেন রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলার রাইখালী কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের বিজ্ঞানীরা। এর মাধ্যমে এদেশের আবহাওয়া উপযোগী মরু অঞ্চলের খেজুর উৎপাদনের দ্বার খুলে দিয়েছে। এসব কথা জানতে পেরে ইতোমধ্যে অনেকে ব্যক্তিগত উদ্যোগে খেজুর বাগান সৃজনের জন্য চারা সংগ্রহের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। এতে বাণিজ্যিকভাবে খেজুর উৎপাদনের ব্যাপক সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। দেশে সর্ব প্রথম বাণিজ্যিকভাবে মরুর খেজুর উৎপাদন করে সফল হয়েছে ময়মনসিংহ জেলাধীন ভালুকার আব্দুল মোতালেবের খেজুর বাগানে। এর পরেই কাপ্তাইয়ের রাইখালী কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের এ খেজুর উৎপাদন সম্ভব হল।

রাইখালী কৃষি গবেষণা কেন্দ্র সূত্রে জানা গেছে, ২০০৮-০৯ সালে এই কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের বিজ্ঞানীরা সৌদি আরব থেকে সরাসরি কয়েক’শ খেজুরের বীজ নিয়ে এসে গবেষণার কাজ সম্পন্ন করে সেগুলোর চারা মাঠ পর্যায়ে রোপন করে। কয়েক’শ চারার মধ্যে এ বছর মাত্র ২০টি গাছে ফুল আসে। এর মধ্যে কয়েকটি গাছে প্রচুর পরিমাণে ফল ধরে। যার আকার ও আকৃতি খুবই আর্কষণীয়। ফলগুলো লম্বায় ৪ থেকে ৪ দশমিক ৬০ সেঃমিঃ লম্বা হয় এবং প্রস্থে ২ থেকে ২ দশমিক ৫০ সেঃমিঃ হয়। একেক এবটি খেজুরের ওজন ১২ থেকে ১৫ গ্রাম এবং বীজের ওজন প্রায় আধা গ্রাম। এ খেজুরের আদিনিবাস মেসোপটেমিয়া। এর উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম ফিনিক্স ডেকটাইলিফেরা ( Phoenix dactylifera )

kp_DMEABS

এ খেজুরের স্ত্রী পুরুষ উভয় গাছে ভিন্ন ভিন্ন ফুল আসে। ফলের ভালো আকার আকৃতির জন্য পুরুষ ফুলের রেণু খুবই প্রয়োজনীয়। বীজের মাধ্যমে বংশ বিস্তার করলে স্ত্রী গাছ পাওয়ার হার খুবই কম। তাই খেজুর গাছের গোড়ার চারপাশের সাকার বা তেউড় আলাদা করে খেজুরের বংশ বিস্তার করাই উত্তম। এতে মাতৃ গুণাগুণ বজায় থাকে। তেউড় আলাদা করার মৌসুম হল বর্ষাকাল। চারার ব্যাস ১০ সেঃমিঃ এবং ওজন ১৫ থেকে ২০ কেজি হলে বসানোর উপযুক্ত হয়। তেউড় বসানোর আগে বেশ কিছু পাতা কেটে দেওয়া হয়। এসব চারায় সাধারণ শিকড় থাকে না। তাই ছোট তেউড় আলাদা করে নিয়ে নার্সারীর কেয়ারীতে বসিয়ে সবল করে শিকড় তৈরি করে নেওয়া হয়। গাছ বসানোর ৪ থেকে ৫ বছর পর ফুল এলেও ভালো ফলনের জন্য আরো ২ থেকে ৩ বছর কোন কোন ক্ষেত্রে ৬ থেকে ৭ বছর লেগে যায়। ফুল ফোটা থেকে শুরু করে ফল পাঁকা পর্যন্ত সময় লাগে প্রায় ১৮০ থেকে ১৯০ দিন। ফল পাঁকার সময় অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত এর জন্য খুবই তিকর। মূলত দেশী খেজুর শেষ হওয়ার ২ থেকে ৩ মাস পর আরবের খেজুরগুলো পাঁকতে শুরু করে। এদেশের আবহাওয়া অত্যন্ত চমৎকার বিধায় সৌদির খেজুর ব্যাপকভাবে চাষাবাদের সম্ভাবনা রয়েছে।
সূত্র আরও জানায়, এ খেজুর পুষ্টিগত মানের অত্যন্ত ভরপুর। ভিটামিন ‘এ ও বি’ সমৃদ্ধ এ খেজুরের প্রতি ১শ’ গ্রাম শাঁসে ২শ৮২ ক্যালরি শক্তি পাওয়া যায়। ফলের মধ্যে রয়েছে অধিক পরিমাণ খনিজ লৌহ । প্রতি ১শ’ গ্রাম শাঁসে রয়েছে শতকরা ২৪ দশমিক ১ ভাগ জলীয় রস, প্রোটিন ৩ ভাগ, স্নেহ ২ ভাগ, খনিজ ১ দশমিক ৩ ভাগ, আঁশ ২ দশমিক ১ ভাগ, শর্করা ৬৬ দশমিক ৩ ভাগ, ক্যালসিয়াম ৭ ভাগ, ফসফরাস ৮ ভাগ, লৌহ ১০ দশমিক ৬ ভাগ। এ খেজুর চাষের ক্ষেত্রে বাড়তি কোন পরিচর্যার প্রয়োজন হয় না। তবে ফুল থেকে ফল নামানোর সময়টুকু নিবিড় ভাবে পর্যবেণ করা দরকার। কারণ ফল কাটার মৌসুমে আমাদের দেশে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বেশী থাকে।

রাইখালী কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানীক কর্মকর্তা ডঃ এএসএম হারুন অর রশিদ ও বৈজ্ঞানীক কর্মকর্তা শ্যাম প্রসাদ চাকমা জানান, আরবের খেজুর নিয়ে তারা অকান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। তারা আশা করছেন গবেষণার মাধ্যমে খুবই শীঘ্রই আরবের খেজুর এদেশের মাটিতে জাত হিসাবে অবমুক্তায়িত করা সম্ভব হবে। এতে অল্প সময়ে কম খরচে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে মরুর খেজুর চাষ করা সম্ভব হবে। এক সময় আসবে যেসময় সৌদি আরব থেকে আর খেজুর আমদানীর প্রয়োজন হবে না।

তারা আরও জানান, ইতোমধ্যে পাহাড়ী অঞ্চলে চাষাবাদের জন্য অনেকেই ইতিমধ্যে চারা সংগ্রহের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তাইএ খেজুর চাষে ব্যাপক অর্থনৈতিক সম্ভবনা রয়েছে বলে তারা ধারনা করছেন।
–হিলবিডি২৪/সম্পাদনা/সিআর.

 

Print Friendly