বান্দরবানের আলীকদমে রবি শস্যের জমি তামাকে ভরপুর

আলীকদম প্রতিনিধি, হিলবিডিটোয়েন্টিফোর ডটকম

Alikadam tamak news Pic 27,2,14hillbd24.com

বান্দরবানের আলীকদম উপজেলায় চারিদিকে শুধু তামাক আর তামাক। প্রতিবছর হুহু করে বেড়ে চলছে তামাকের চাষ। তামাকের ভয়াল বিস্তারে রবিশস্যের আকাল দেখা দিয়েছে। রবি মৌসুমে তামাকে ভরপুর কৃষি জমি। চাষীদের তামাক চাষে নিরূৎসাহিত করতে তেমন কোনো পদক্ষেপ দেখা মেলেনি এখানো। নানা ভাবে সরকারের ভর্তুকী দেওয়া ইউরিয়া সার তামাক ক্ষেতে যাচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

স্থানীয় কৃষি বিভাগের তথ্য মতে, উপজেলায় কৃষি জমির পরিমাণ ১ হাজার ৯৩০ হেক্টর। এরমধ্যে ৩ হাজার ২৩০ হেক্টর একফসলী, ২ হাজার ৭০০ হেক্টর দো-ফসলী, ৪০০ হেক্টর তিন ফসলী জমি রয়েছে। এসব কৃষি জমির বর্তমানে মাতামুহুরী নদী, তৈন খাল ও চৈক্ষ্যং খালের চর জমিতে প্রায় ৯০ ভাগেই তামাক চাষ করা হচ্ছে বলে স্থানীয়দের ধারণা।

একাধিক সূত্রে জানা গেছে, তামাক কোম্পানীর প্রতিনিধিরা চাষীদের তামাক চাষের জন্য আগাম ঋণ দিয়ে থাকেন। এছাড়াও এলাকার কতিপয় তামাক ব্যবসায়ী চাষীদের কাছ থেকে অর্ধেকমূল্যে আগাম তামাক কিনে নেয়। বর্তমানে নাম করা নামকরা বেশ কিছু তামাক কোম্পানীর লোকজন স্থানীয় চাষীদের তামাক চাষে প্রলুব্ধ করছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

স্থানীয় কৃষক ঐরামনি তংচংগ্যা বলেন, তামাক ক্ষেতে ঋণ হিসেবে কোম্পানি ও স্থানীয় তামাক ব্যবসায়ীরা টাকা দেয়। আমি কোম্পানি ও তামাক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে দেড় লাখ টাকার ঋণ নিয়েছি। তিনি ব্রিটিশ-আমেরিকান টোব্যাকো কোম্পানির চাষী বলে স্বীকার করেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, তামাক প্রক্রিয়াজাতকরণে প্রতিবছর তামাক চুল্লিতে হাজার হাজার মন কাঠ জ্বালানী হিসেবে পোড়ানো হয়। আর এসব জ্বালানী কাঠের চাহিদা মেটানো হয় ব্যক্তি মালিকানাধীন, সরকারি খাস বনভূমি ও সংরক্ষিত বনভূমি থেকে। প্রতিবছর তামাক চুল্লিতে জ্বালানী কাঠ পোড়ানোর ফলে আশংকাজনক হারে বনের মানচিত্রের পরিধি ছোট হয়ে আসছে। প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর বিরূপ ক্ষেত্র তৈরী হচ্ছে। তামাকের কারণে প্রতিবছর জ্বালানী কাঠ পোড়ালেও তামাক কোম্পানিগুলো সেভাবে বনায়ন সৃষ্টির ব্যাপারে পদক্ষেপ নেন না। দীর্ঘদিন ধরে ব্রিটিশ-আমেরিকান ট্যোবাকো প্রতিবছর গাছের চারা বিতরণ করে আসছে। তবে গেল কয়েক বছর ধরে নাম রক্ষায় বৃক্ষ মেলায় দুয়েকটি তামাক কোম্পানী কিছু গাছের চারা বিতরণ করতে দেখা গেছে। চারা বিতরণ পর সুরক্ষার কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। তবে বৃক্ষ মেলায় প্রদর্শনী ষ্টল ছবি তোলা নিয়ে কোম্পানির লোকজনদের ব্যস্ততার চিত্র দেখা মেলে। প্রতিবছর যে হারে তামাক চাষে বৃক্ষ নিধন হয় সে তুলনায় বন সৃষ্টিতে উদ্যোগ নেই কারোর। নদীর চর ও ঢালু জমিতে তামাক চাষের কারণে উর্বর মাটি ক্ষয় হচ্ছে বেশি।

সুত্র মতে, গত ২০০৫ সালে ১৫ মার্চ বাংলাদেশ গেজেটে প্রকাশিত রিপোর্টে বলা হয়, ‘যেহেতু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ৫৩তম সম্মেলনে ধুমপান ও তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার নিরূৎসাহিত করার জন্য ফার্মওয়ার্ক কনভেনশন অন ট্যোবাকো কন্ট্রোল (এফসিটিসি) নামীয় কনভেনশনে ও ১৬ জুন ২০০৩ তারিখে স্বার এবং ১০ মে ২০০৪ তারিখে অনুস্বার করেছে বাংলাদেশ। এ কনভেনশনের বিধানবলী বাংলাদেশে কার্যকর করার ল্েয ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্যের উৎপাদন, ব্যবহার, ক্রয়-বিক্রয় ও বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণ করা সমীচীন ও প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হলেও তামাক উৎপাদন নিয়ন্ত্রণে নেই।

স্থানীয় কৃষক ঐরামনি তংচংগ্যা আরও বলেন, একর প্রতি জমিতে বোরো ধান চাষে ৪৫ থেকে ৫২ হাজার টাকা আয় হয়। সেখানে তামাক চাষে একরপ্রতি দেড় লাখ থেকে এক লাখ ৮০ হাজার টাকার তামাক বিক্রি করা যায়। তামাক ক্ষেত পরিচর্যার জন্য অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক প্রয়োগ করা হয়। তামাক ক্ষেতে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও উদ্বেগজনক কীটনাশক ব্যবহারের ফলে নদী তীরবর্তী তামাক ক্ষেতে সেচের বিষাক্ত পানি নদীতে পড়ছে।

পরিবেশবাদী ও মানবাধীকারকর্মী মনিন্দ্র ত্রিপুরা বলেন, প্রতিবছর তামাক চাষ বাড়ার কারণে পরিবেশের যে নিধারুণ ক্ষতি হচ্ছে তা বলা অপেক্ষা রাখে না। অনিয়ন্ত্রিত তামাক চাষের ফলে প্রাকৃতিক সবুজ বনানীর পরিবেশের ভারসাম্য ও প্রাণী বৈচিত্র হুমকির মূখে পড়েছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ আলী আহমেদ বলেন, তামাক ক্ষেতে যাতে সরকারী ভর্তুকি সার না যায় সেদিকে কৃষি বিভাগ সজাগ রয়েছে। কেউ এ ধরণের অনিয়মে জড়ালে তার বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
–হিলবিডি২৪/সম্পাদনা/সিআর.

Print Friendly