বান্দরবান আসনে আওয়ামীলীগ প্রার্থী বীর বাহাদুর ও বিদ্রোহী প্রার্থী প্রসন্নের মধ্য তীব্র লড়াই হবে

বান্দরবান প্রতিবেদক, হিলবিডিটোয়েন্টিফোর ডটকম

banhillbd24.comবিরোধী দল নির্বাচনে অংশ না নিলেও তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়েছেন বান্দরবান ৩০০ নম্বর আসনের আওয়ামীলীগ মনোনীত প্রার্থী ও কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক (চট্টগ্রাম অঞ্চল) বীর বাহাদুর। নির্বাচনে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে নেমেছেন জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি প্রসন্ন কান্তি তংচংগ্যা। আওয়ামীলীগের মনোনীত প্রার্থীর বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ও দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গে অভিযোগে জেলা আওয়ামীলীগ তাঁকে বহিষ্কার করেছে। তবে কেন্দ্রীয়ভাবে তাকে এখনো বহিষ্কার করা হয়নি। তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এদিকে আ’লীগের মনোনীত প্রার্থী ও চারবারে নির্বাচিত সাংসদ বীর বাহাদুরের সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে বলে নির্বাচন বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বান্দরবান ৩০০ আসনে চারজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এরা হলেন, আ’লীগ মনোনীত প্রার্থী বীর বাহাদুর। আ’লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী প্রসন্ন কান্তি তঞ্চঙ্গ্যা, আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফের) জেলা আহ্বায়ক ছোটন কান্তি তংচংগ্যা ও সাংবাদিক মো: কামরুজ্জামান।

মনোনয়নপত্র সংগ্রহের পর থেকে চারবারের নির্বাচিত সাংসদ ও আ’লীগের মনোনীত প্রার্থীর সঙ্গে দ্বন্দ্ব তীব্র হয়ে উঠেছে জেলা আ’লীগের সভাপতি প্রসন্ন কান্তি তংচংগ্যার। প্রতীক বরাদ্দের পর থেকে শীত উপেক্ষা করে উভয়ই ছুটেছেন ভোটারদের কাছে। তবে পঞ্চমবারের মতো সাংসদ হওয়ার জন্য বীর বাহাদুর বিভিন্ন ধরণের হিসাব-নিকাস কষছেন। আবার এই দুই প্রার্থী একে অপরের চরিত্র নিয়েও কথাবার্তা বলেছেন। তাই সবমিলিয়ে অতীতে কে কি ধরণের আচরণ করেছেন ও কে কি ছিলেন নির্বাচনে এইসব বিষয় প্রাধান্য পাচ্ছে।

এদিকে প্রচারণায় বসে ছিলেন না ছোটন কান্তি তংচংগ্যা ও মো: কামরুজ্জামান। তারাও জয়ের আশায় প্রচার-প্রচারণা চালিয়েছেন। তবে এই দুই প্রার্থী এ আসনের জন্য তেমন একটা ফ্যাক্টর হিসেবে মনে করছেন না ভোটাররা।

প্রসন্ন কান্তির ঘনিষ্ঠজনদের সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে আ’লীগের সভাপতি পদে থেকে প্রতিপক্ষ বীর বাহাদুরকে চারবার এমপি নির্বাচিত করেছেন। এবার প্রসন্ন কান্তি তংচংগ্যা দলের প্রার্থীর বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন অন্যায়, দুর্নীতি ও তৃণমূল নেতাদের প্রতি অবহেলার অভিযোগ এনে লড়ছেন দেয়াল ঘড়ি প্রতীক নিয়ে।

প্রসন্ন কান্তি তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, আমার সভাপতিত্বে চারবার সাংসদ নির্বাচিত করে আ’লীগকে উপহার দিয়েছি। কিন্তু গত পাঁচ বছরে ব্যাপক উন্নয়ন হলেও উন্নয়নে পক্ষ পাতিত্ব ও বৈষম্য করা হয়েছে। তৃণমূল নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন করা হয়নি। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও স্বেচ্ছাচারিতা করেছেন আ’লীগের বর্তমান সাংসদ। আমি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছি আ’লীগের বিরুদ্ধে নয়, ব্যক্তি বীর বাহাদুরের বিরুদ্ধে।

এছাড়া নির্বাচনী প্রচারনা শেষ দিনে আগে শুক্রবার (৩ ডিসেম্বর) প্রসন্ন কান্তি তঞ্চঙ্গ্যা তার বাসভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে আশংকা করেছেন, বীর বাহাদুর তার পরাজয় ঠেকাতে লামা, আলীকদম ও নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার মোট ২৩টি কেন্দ্রে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে। তিনি অভিযোগ করে বলেন তার কর্মী বাহিনীকে বিভিন্ন ধরণের হুমকি-ধামকি দিচ্ছেন বীর বাহাদুরের নেতাকর্মীরা।

এদিকে বীর বাহাদুরকে ঠেকাতে প্রসন্ন কান্তি তংচংগ্যার পক্ষে সরাসরি মাঠে নেমেছেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস)। তার পক্ষে দলের নেতাকর্মীদের প্রচার-প্রচারণায় কাজে লাগানো হচ্ছে। দুর্গম এলাকায় গিয়ে ভোটারদের মনজয় করতে বিভিন্ন যুক্তি উপস্থাপন করছেন। জেলা পিসিজেএসএস সাধারণ সম্পাদক ক্যবা মং মারমা জানান,কেন্দ্রের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কাজ করছেন নেতাকর্মীরা।

অরদিকে নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নেওয়ায় আ’লীগের দুই প্রার্থীর মধ্যে লড়াই তীব্র হবে। জেলা বিএনপি নীতিগতভাবে নির্বাচন বয়কট করলেও কৌশলগত কারণে বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে ভিতরে ভিতরে কাজ করছে বলে গুঞ্জন শুনা যাচ্ছে।বীর বাহাদুরকে ঠেকাতে জেলা বিএনপি এই কৌশল নিয়েছে। জেলার সিনিয়র নেতারা প্রকাশ্যে বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে কাজ করতে দেখা না গেলেও তৃণমূল নেতাকর্মীদের কাজ করতে নির্দেশ দিয়েছেন বলে শুনা গেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে জেলা বিএনপির এক সিনিয়র নেতা জানান,বীর বাহাদুরকে যে কোনোভাবেই ঠেকাতে হবে। তাকে পরাজিত করতে পারলে ভবিষ্যতে বিএনপি জন্য ভালো হবে।

বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ের ব্যাপারে বীর বাহাদুরকে তেমন একটা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়নি। কিন্তু দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের বিদ্রোহী প্রার্থীর বিরুদ্ধে জয় পেতে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন বীর বাহাদুর। অনেকের মতে, গত চার বার জয় পাওয়ার পেছনে বিএনপি’র ভেতর কোন্দল বিশাল ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু এখন খোদ আ’লীগের ভিতরেই দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়েছে। আ’লীগের একটি অংশ, পিসিজেএসএস ও বিএনপি প্রসন্ন কান্তি তংচংগ্যার পক্ষে সমর্থন থাকায় জয়ের ব্যাপারে বিশাল চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছেন আ’লীগের মনোনীত প্রার্থী। আওয়ামীলীগ মনোনীত প্রার্থী বীর বাহাদুর জানান,আমি চ্যালেঞ্জ মনে করি না। ব্যাপক উন্নয়ন করেছি সাধারণ জনগণের জন্য। চারবার সাংসদ এমনিতে হয়নি। জনগণের ভালোবাসা আছে বলেই তো জয়ী হয়েছি। এবারও জয়ী হবো।

সাতটি উপজেলা ও ৩১টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত বান্দরবান জেলা। এবারের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট ভোটারের সংখ্যা ২লাখ ১৬ হাজার ৭৯০ জন। এরমধ্যে মহিলা ভোটার ১লাখ ২হাজার ৫৪৩ আর পুরুষ ভোটার ১লাখ ১৪ হাজার ২৫৭ জন। জেলার ১৬৩টি ভোট কেন্দ্রের জন্য কক্ষ রয়েছে ৫৯৪টি। দুর্গম ১৩টি কেন্দ্রে হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হবে।

সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আসনটি মূলত আ’লীগের। এই আসনে আ’লীগ প্রার্থী বীর বাহাদুর ১৯৯১ সাল থেকে জয় পেয়ে চারবার সাংসদ নির্বাচিত হন। নির্বাচনে এখন আ’লীগ বনাম আ’লীগ যুদ্ধ চলছে। তার সঙ্গে বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে যুক্ত হয়েছে আ’লীগ পিসিজেএসএস ও বিএনপি। তাই সাধারণভাবে বিদ্রোহী প্রার্থী প্রসন্ন কান্তি তংচংগ্যার জয় পেতে তেমন সমস্যা দেখছেন না সাধারণ ভোটাররা। শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী জেলা আ’লীগের সভাপতি প্রসন্ন কান্তি তংচংগ্যা। তিনি সাংসদ হিসেবে নির্বাচিত হলে বাংলাদেশের ইতিহাসে অনন্য দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করবেন এমনটা মনে করছেন ভোটাররা। দেশের ইতিহাসে এই পর্যন্ত এখনো কোনো শারীরিক প্রতিবন্ধী সাংসদ নির্বাচিত হয়নি। এদিকে জেলা আ’লীগের তৃণমূল নেতাকর্মীরাও নেতৃত্বের পরিবর্তন চাইছেন। তাই তৃণমূলের নেতাকর্মীরা বহিষ্কারের ভয়ে বিরোধী প্রার্থীর পক্ষে নীরবে প্রচারণা চালাচ্ছেন বলে জানা গেছে।

নিরাপত্তা ব্যবস্থার জোরদারঃ
জেলা রিটার্নিং অফিসার ও জেলা প্রশাসক কে এম তারিকুল ইসলাম নির্বাচন সুষ্ঠ, সুন্দর ও গ্রহনযোগ্য করতে সর্বোচ্চ সর্তকতা হাতে নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আ,স,ম মাহাতাব উদ্দিন বলেন, কেন্দ্রে যে কোনো সময় অঘটন ঘটতে পারে এই কথা মাথায় রেখেই নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। প্রত্যেকটি কেন্দ্র ঝুকিপূর্ণ মাথায় রেখে পুলিশ, সেনাবাহিনী, বিজিবি, আনসার যৌথভাবে শান্তি শৃঙ্খলার জন্য যথাযথ দায়িত্ব পালনে ব্রত রয়েছেন।
হিলবিডি২৪/সম্পাদনা/সিআর.

Print Friendly