বান্দরবানের ক্রাইক্ষ্যং-হাংসামা পাড়ার বিজিবি সেক্টর নির্মাণ স্থগিতের দাবি জানিয়ে ঢাকায় নাগরিক কমিটির সংবাদ সন্মেলন

ডেস্ক রিপোর্ট.হিলবিডিটোয়েন্টিফোর ডটকম

adiমঙ্গলবার ঢাকা রিপোর্টাস ইউনিটি গোল টেবিল কক্ষে আয়োজিত সংবাদ সন্মেলনে নাগরিক কমিটির নেতৃবৃন্দ বান্দরবানের ক্রাইক্ষ্যং-হাংসামাপাড়ার বিজিবি সেক্টর নির্মাণের প্রকল্পের কাজ স্থগিতের দাবি জানিয়েছেন।

নেতৃবৃন্দ বলেন, বোমাং সার্কেল চীফ, সংশ্লিষ্ট মৌজা হ্যাডম্যানের সুপারিশ ব্যতীত বিজিবি সেক্টর সদর দপ্তরের জন্য জমি অধিগ্রহণ কার্যত পার্বত্য চট্টগ্রাম ঐতিহ্যবাহী ভূমি ব্যবস্থাপনার নিয়মনীতির সুস্পষ্ট লংঘন। তাই সার্কেল চীফ ও মৌজা হেডম্যানের সাথে আলোচনার পূর্বে ভূমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া স্থগিত রাখা। পাশাপশি নেতৃবৃন্দ ১৯৯৭ সালে স্বাক্ষরিত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি পরিপূর্ণ বাস্তবায়নের জন্য সময়সূচী ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নেরও সুপারিশ করেছেন।

 নাগরিক কমিটির একটি প্রতিনিধি দল সম্প্রতি বান্দরবানের রোয়াংছড়ি উপজেলার ক্রাইক্ষং-হাংসামাপাড়া এলাকায় বিজিবির সেক্টর সদর দপ্তরের জন্য আদিবাসীদের জমি ও শ্মশানভূমি দখল এবং স্থাপনা নির্মাণের নামে পাহাড়িদের ভূমি থেকে উচ্ছেদের অপকৌশল ঘটনা সরেজমিন পরিদর্শনোত্তর  এ সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করা হয়েছে বলে স্বাক্ষরিত এক বার্তায় নাগরিক কমিটির সদস্য এ্যাডভোকেট নীলুফার বানু জানান।

প্রেস বার্তায় বলা হয়, সংবাদ সন্মেলনে এসময় অন্যান্যর মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট কলামিস্ট ও গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদ, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি জিয়াউদ্দিন তারিক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস, মানবাধিকার কর্মী এ্যাডভোকেট নীলুফার বানু, চলচ্চিত্র নির্মাতা রাশেদ রাইন ও কাপেং ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক পল্লব চাকমা প্রমুখ। সরেজমিন পরিদর্শনোত্তর নাগরিক প্রতিনিধি দলের মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রাজীব মীর। সংবাদ সন্মেলনে সঞ্চালনা করেন আদিবাসী সংগঠক দীপায়ন খীসা।

প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য স্থানীয়দের অভিযোগের ভিত্তিতে নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে শিক্ষক, মুক্তিযোদ্ধা, মানবাধিকার কর্মী ও সাংবাদিকদের সমন্বয়ে একটি নাগরিক প্রতিনিধি দল গত ২০ আক্টোবর সরেজমিন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। নাগরিক প্রতিনিধি দলে ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি জনাব জিয়া উদ্দিন তারিক আলি, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক জনাব রাজীব মীর, কাপেং ফাউন্ডেশনের দীপায়ন খীসা, দেশ টিভির সাংবাদিক নজরুল কবির, একাত্তর টিভির সাংবাদিক নয়ন আদিত্য, ডেইলী স্টারের তামান্না রহমান, সাহাদাত হোসেন, প্রথম আলোর প্রণব বল, কালের কন্ঠের বিপ্লব রহমান, বাংলা নিউজ ২৪ এর নাজমুল হক, বিডি নিউজ ২৪ এর সালাউদ্দিন ওয়াহিদ প্রীতম এবং ঢাকা ট্রিবিউনের আবিদ আজাদ।

লিখিত বক্তব্যে রাজীব মীর উল্লেখ করেন, একটা বিশাল এলাকা কোনও পূর্ব ঘোষণা ছাড়া কাঁটা তারের বেড়া দেয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামের অনগ্রসর আদিবাসী জনগণ ভূমি দখলদারদের কাছে সবকিছু হারিয়ে এখন প্রায় নিঃস্ব। সম্প্রতি বান্দরবানের রোয়াংছড়ি উপজেলার ক্রাইক্ষং-হাংসামাপাড়া এলাকায় বিজিবির সেক্টর সদর দপ্তরের জন্য আদিবাসীদের জমি ও শ্মশানভূমি দখল এবং স্থাপনা নির্মাণ নতুন সংযোজন মাত্র। স্থানীয় নেতৃবৃন্দ বা জনগন কারও সাথে আলোচনা ব্যতিরেকে এ ধরণের দখল কার্যক্রম তাই প্রশ্নবিদ্ধ। এতে পাড়াবাসির উচ্ছেদের ভয় তো আছেই সাথে এ অঞ্চলের জনমিতিক বিন্যাসও নষ্ট হবে। তৎকালীন জেলা প্রশাসকের মৌখিক নির্দেশে পার্বত্য শাসনবিধি ১৯০০-এর আইন অনুযায়ী পাড়াবাসির ২৫ পরিবারের বসত ভিটার জন্য ৩০ শতক করে মোট ৭.৫০ একর জমি ১৯৯৩ সালে মৌজার হেডম্যান কর্তৃক দেওয়া বন্দোবস্ত দলিলও রয়েছে।

লিখিত বক্তব্য তিনি ৬ দফা দাবি তুলে ধরেন। সেগুলো হল এক.আদিবাসী জমি অধিগ্রহণের কোনও ক্ষেত্রেই রাজার কোনও অবস্থান নেই । রাজাকে অধিগ্রহণ বিষয়ক কোনও কমিটিতে রাখা হয় না ,কাজেই তাঁর ভুমিকা অনুল্লেখ্য । শাসন যেহেতু বিলুপ্ত হয় নাই এবং ১৯৯৭ সালের স্বাক্ষরিত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিতেও ভূমি ব্যবস্থাপনায় প্রথাগত অইন ,রীতি ও পদ্ধতিকে গ্রাহ্য করা হয়েছে। সেই হেতু ভূমি অধিগ্রহণ কিংবা ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত বিষয়ে রাজার ভুমিকা অগ্রাহ্য করবার কারণ আছে বলে নাগরিক কমিটি মনে করে না। দুই. যে কোনও অধিগ্রহণে হেডম্যানের সুপারিশ প্রয়োজন হয় । হেডম্যানকে ভুলিয়ে বা প্রতারণা করে কোন ব্যক্তি সুপারিশ নিলেও নিতে পারে কিন্তু বিজিবির সেক্টর সদর দপ্তরের জন্য হেডম্যান এর সুপারিশ ছাড়া জমি দখল কিছুতেই গ্রহণযোগ্য নয় ।তিন. পার্বত্য শাসনবিধি ১৯০০-এর আইন অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রামে খাস জমি বলতে কিছু নাই । জমির মালিকানা সত্ব মৌাজা হ্যাডম্যানের কাছে কিংবা সরাসরি সার্কেল চীফ এর হাতে ন্যস্ত থাকে। কাজেই খাস জমি ধারণা থেকে দরিদ্র আদিবাসীদের জায়গাজমি অধিগ্রহণ খুবই প্রশ্নবিদ্ধ ।চার. উপরন্তু পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি অনুযায়ী ছয়টি স্থায়ী সেনানিবাস ও বিজিবি ক্যাম্প ব্যতীত সামরিক ও আধা সামরিক বাহিনীর অন্যান্য অস্থায়ী ক্যাম্প সরিয়ে নেবার কথা থাকায় বিষয়টি চুক্তি পরিপন্থী। নানা প্রক্রিয়ায় এসকল জমি দখলের কাজ এগুচ্ছে যা পাহাড়ের সম্প্রীতির পরিবেশ বিনষ্ট হচ্ছে। পাঁচ. আগে বাঙ্গালি বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে জমি দখল করার অভিযোগ উঠলেও এখন সরাসরি প্রতিরক্ষার কাজে নিয়োজিত বাহিনীকে এরকম অধিগ্রহণে উৎসাহিত করা আশাব্যঞ্জক নয় । ছয. জাতীয় আইনে কোন নাগরিককে স্বীয় ভূমি থেকে উচ্ছেদ করা অন্যায় এবং আন্তর্জাতিক আইনে কোন ব্যক্তি বা সমষ্টিকে তাদের মুক্ত, অবহিত ও পূর্ব সম্মতিব্যতিরেকে কোন ভুমি থেকে উচ্ছেদকরণ অবৈধ ।

তিনি নাগরিক কমিটির পক্ষ থেকে দরিদ্র আদিবাসীদের ভুমি রক্ষায় বান্দরবানের রোয়াংছড়ি উপজেলার ক্রাইক্ষং-হাংসামাপাড়া এলাকায় বিজিবির সেক্টর সদর দপ্তরের জন্য আদিবাসীদের জমি ও শ্মশানভূমি দখল এবং স্থাপনা নির্মাণ কাজ বন্ধ করবার আহবান এবং এখানে কোনও অধিগ্রহণ যাতে না হয় সে বিষয়টিও নজর রাখবার জন্য সরকারকে অনুরোধ জানান।

সংবাদ সন্মেলনে সংবাদ সম্মেলনে জিয়াউদ্দিন তারিক আলি বলেন, পার্বত্য চুক্তি অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রামে কোন খাস জমি নেই। পার্বত্য চট্টগ্রামে এক ধরনের সামরিক শাসন চলছে যা গণতন্ত্রের পরিপন্থী। তিনি জাতীয় সংসদে বিজিবির ক্যাম্প স্থাপনের জন্যে অবৈধভাবে ভূমি গ্রহণের বিষয়টি উত্থাপন হওয়া দরকার বলে মনে করেন।

শিক্ষক রোবায়েত ফেরদৌস তার বক্তব্যে বলেন, এখনো তিন পার্বত্য জেলায় সামরিক শাসন বহাল রয়েছে। তিন জেলায় ৬টি ক্যাম্প। রাষ্ট্র আদিবাসীদের পর মনে করে। আর বাঙালীদের আপন মনে করে সেখানে তাদের বসিয়ে দেয়া হচ্ছে। এতে বোঝা যায় পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসীদের সংখ্যালঘু করার চক্রান্ত চলছে। পার্বত্য শান্তি চুক্তির ধারা না মেনে রাজা, হেডম্যান, কার্ব্বারীদের সাথে আলোচনা না করে ভূমি অধিগ্রহণ করা হচ্ছে। সামরিক শাসনে গণতন্ত্রে মুক্ত চিন্তার বিকাশ হয় না। তাই যে কোন মূল্যে আদিবাসীদের অধিকার, ভূমি রক্ষা করতে হবে বলে তিনি সবার কাছে আহ্বান জানান।

বিশিষ্ট কলামিস্ট ও গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেছেন, দেশের সকল আদিবাসী জনগোষ্ঠীর উপর যে অনাকাঙ্খিত ঘটনার জবাবদিহিতা প্রদানের জন্য সরকারের কাছে আহ্বান জানান এবং সংবিধান অনুসারে তাদের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য সরকারের কাছে অনুরোধ করেন। এছাড়া তিনি সংবাদ সম্মেলনে উত্থাপিত ৩ দাবি বাস্তবায়ন দরকার বলে উল্লেখ করেন। তিনি এ বিষয়টি জাতীয় সংসদে উত্থাপন এবং যতক্ষণ পর্যন্ত অমীমাংসিত থাকবে ততদিন পর্যন্ত বান্দরবানের ক্রাইক্ষ্যং-হাংসামাপাড়ার বিজিবি সেক্টর নির্মাণের প্রকল্প কাজ স্থগিত রাখার জন্য সরকারের কাছে আহ্বান জানান।
–হিলবিডি২৪/সম্পাদনা/সিআর.

Print Friendly