পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়িত না হওয়ার পেছনে দেশী-বিদেশী গোষ্ঠীর ষড়যন্ত্রের হাত রয়েছে— সন্তু লারমা

স্টাফ রিপোর্টার, হিলবিডিটোয়েন্টিফোর ডটকম 

M N Larma -02

পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্রবোধিপ্রিয় লারমা(সন্তু লারমা) অভিযোগ করে বলেছেন, বিগত ১৬ বছরেও পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়িত না হওয়ায় জুম্ম জনগনের অস্তিত্ব বিলুপ্তির হতে চলেছে। পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়িত না হওয়ার  পেছনে দেশী-বিদেশী গোষ্ঠীর ষড়যন্ত্রের হাত রয়েছে। তিনি বলেন, বর্তমান মহাজোট সরকার বিগত পাঁচ বছরে ক্ষমতায় থেকেও পার্বত্য চুক্তির উল্লেখ্য কোন ধারা বাস্তবায়নে এগিয়ে আসেনি। তাই এ থেকে বুঝা যায় যে সরকারই  ক্ষমতায় আসুক না কেন কোন সরকারই পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নে এগিয়ে আসবে না। এজন্য সরকারকে পার্বত্য চুক্তি যথাযথ বাস্তবায়নে বাধ্য করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে এসে আন্দোলন-সংগ্রামে সামিল হতে হবে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক সাংসদ মানবেন্দ্র নারায়ন লারমার(এমএন লারমা) ৩০ তম মৃত্যু বার্ষিকী আজ রোববার(১০ নভেম্বর) রাঙামাটিতে আয়োজিত স্মরণ সভায় সন্তু লারমা এ সব কথা বলেন।

জেলা শিল্পকলা একাডেমী মিলনায়তনে এমএন লারমা মেমোরিয়্যাল ফাউন্ডেশন ও এম এন লারমা স্মৃতি গণ পাঠাগারের উদ্যোগে আয়োজিত স্মরণ সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্রবোধিপ্রিয় লারমা(সন্তু লারমা)। এমএন লারমা মেমোরিয়্যাল ফাউন্ডেশন সভাপতি বিজয় কেতন চাকমার সভাপতিত্বে বক্তব্যে দেন, শিক্ষাবিদ প্রফেসর মংসানু চৌধুরী, সাহিত্যক শিশির চাকমা, পার্বত্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতির নেত্রী কল্পনা চাকমা ও যুব সমিতির নেতা রিপেশ চাকমা। এর আগে এমএন লারমার স্মরণে কবিতা অবৃত্তির আয়োজন করা হয়। সন্ধ্যায় শিল্পকলা একাডেমীর অস্থায়ী শহীদ বেদীতে হাজার বাতি প্রজ্জ্লন  ও ফানুস বাতি উড়ানো হয়।

প্রধান অতিতির বক্তব্যে সন্তু লামা আরও বলেন, ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির স্বাক্ষরের পর নতুন করে ষড়যন্ত্র শুরু হয়। নতুন ষড়যন্ত্রে নিষ্পেষিত হয় জুম্ম জনগণ। গত ১৬ বছরে ইউপিডিএফ সশস্ত্র সন্ত্রাসীর নারকীয় ঘটনায় ঘটিয়ে তিন শতাধিক নিরাপদ ব্যক্তিকে হত্যা করেছে। জুম্ম জনগণকে অর্থনৈতিকভাবে তিগ্রস্থ করেছে। ইউপিডিএফ পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নে এবং জনসংহতি সমিতির নেতত্বকে বাধা গ্রস্থ করছে। ইউপিডিএফ ও সংস্কারপন্থী রুপায়ন দেওয়ানরা পার্বত্য চট্টগ্রামকে আশান্ত করছেন। তারা পার্বত্য চট্টগ্রামের বুকে সন্ত্রাস করে চলেছে। আর এসবের পেছনে দেশী-বিদেশী ষড়ষন্ত্রের হাত রয়েছে।

এমএন লারমা দেশী-বিদেশী কুচক্রীর ষড়যন্ত্রের কারণে শহীদ হতে হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এমএন লারমাকে কেন হত্যা করা হয়েছে তা পার্টির অভ্যন্তরে আলোচিত হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম সমাজে তেমন একটা আলোচিত হয়নি। পার্বত্য চট্টগ্রামের শিক্ষিত ও সুশীল সমাজ ও জুম্ম সমাজের কাছে প্রতিক্রিয়াও তেমন একটা ছিল না।

পার্বত্য চট্টগ্রামে শত শত যুবক-যুবতি শিক্ষিত হয়েছে এবং সরকারী চাকুরীজীবির হারও বেড়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব শিক্ষিত যুব সমাজ ও চাকুরীজীবিরা জুম্ম জনগনের অধিকার আদায়ে সক্রিয় ভূমিকা দোখা যায় না। যা অত্যন্ত হতাশা ব্যঞ্জক। আবার অনেক শিক্ষিত যুব সমাজ পার্বত্য চুক্তিকে স্বীকার করতে চায় না। যা জুম্ম জনগন বিলুপ্তির পথে ধাবিত হচ্ছে এবং ১৩ টি জাতিগোষ্ঠীর অস্তিত্ব বিলীন হওয়ার পথে রয়েছে।
পার্বত্য জনসংহতি সমিতির সভাপতি সন্তু লারমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে তিন সার্কেল চীফ, হেডম্যান, গ্রাম প্রধান ছিলেন। কিন্তু তাদের কাপ্তাই বাধের নিয়ে বলার সাহস কারোর ছিল না। তারা নিজেদের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে নিজেদের এগিয়ে নিয়েছেন। কিন্তু এমএন লারমা সাহস করে বিরোধীতা করেছিলেন। সে সময় জুম্ম সমাজের শিক্ষিত সমাজ বিরোধীতা ভূমিকা নিয়েছিলেন।

সন্তু লারমা বলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুদকার ও সচিব নব বিক্রম কিশোর ত্রিপুরা পাহাড়ি সমাজের লোক। তারা কেন পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নে এগিয়ে আসছেন না তাদের কাছে কেউ জানতে চান না। তারা চুক্তি বাস্তবায়নে বিরোধিতা করে যাচ্ছেন। পাশাপাশি খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের এমপিরাও একইভাবে চুক্তি বাস্তবায়নে এগিয়ে আসছেন না। একমাত্র পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য দাবি করে আসছে।

তিনি বলেন এমএন লারমা শুধু জুম্ম জনগনের নেতা ছিলেন না, তিনি সারা বিশ্বের মেহনতি মানুষের নেতা ছিলেন। তিনি শ্রেনীহীন ও শোষনহীন সমাজ ব্যবস্থার স্বপন দেখেছিলেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগনের অস্তিত্ব সংরক্ষনের জন্য, তাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক অধিকার সংরক্ষনের জন্য আন্দোলন-সংগ্রাম করেছিলেন। অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে এমএন লারমার জুম্ম জনগনের জন্য অমৃত্যু সংগ্রাম করেছিলেন। তাই নিজের জীবনকে তিনি উৎস্বর্গও করে গেছেন। তাই তার যে নীতি, আদর্শ ও সংগ্রামের চেতনাকে বুকে ধারন করে এবং তার যে স্বপ্ন ছিল তার বাস্তবায়নে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগনের বেঁচে থাকার নুন্যতম অধিকার হিসেবে পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য সরকারকে বাধ্য করতে সবাইকে একাত্নতা হয়ে এগিয়ে এসে আন্দোলন-সংগ্রামে সামিল হওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানান।
–হিলবিডি২৪/সম্পাদনা/সিআর.

Print Friendly