পার্বত্য চুক্তির ১৭তম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ঢাকায় আয়োজিত সংবাদ সন্মেলনের সন্তু লারমার বিস্তারিত বক্তব্যে

 

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ১৭তম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে শনিবার(২৯ নভেম্বর) ঢাকার সুন্দরবন হোটেলে আয়োজিত পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ চেয়ারম্যান ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতি(পিসিজেএসএস) সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমার(সন্তু লারমা) সংবাদ সন্মেলনের হুবহু বক্তব্যে তুলে ধরা গেল—-

 

pcjss luguhillbd24.com

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ১৭তম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের উপর পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির
সংবাদ সম্মেলন
২৯ নভেম্বর ২০১৪, শনিবার, সকাল ১১টা, হোটেল সুন্দরবন, ঢাকা

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ১৭তম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির পক্ষ থেকে আন্তরিক শুভেচ্ছা গ্রহণ করুন।
আপনারা জানেন যে, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে স্বাক্ষরিত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির দীর্ঘ ১৭ বছর অতিক্রান্ত হতে চলেছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যাকে রাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমাধানের লক্ষ্যেই ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর এই ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এই চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরে আসার স্বপ্ন দেখেছিল পার্বত্যবাসী।

আশা করেছিল পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের মাধ্যমে বিশেষ শাসনব্যবস্থা প্রবর্তনের মধ্য দিয়ে এতদাঞ্চলের মানুষের শাসনতান্ত্রিক অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠা পাবে। এই শাসনতান্ত্রিক অংশীদারিত্বের মাধ্যমে এতদাঞ্চলের পাহাড়ি-বাঙালি স্থায়ী অধিবাসীরা নিজেদের উন্নয়ন নিজেরাই নির্ধারণ করার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা তৈরি হবে। কিন্তু চুক্তি স্বাক্ষরের পর ১৭ বছরেও পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির যথাযথভাবে বাস্তবায়িত না হওয়ার কারণে আজ অবধি পার্বত্যবাসীর সেই শাসনতান্ত্রিক অংশীদারিত্ব যেমনি নিশ্চিত হয়নি, তেমনি অর্জিত হয়নি পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার সেই কাাক্সিক্ষত রাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ সমাধান।

১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের পর ৩ বছর ৮ মাস রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকাকালে শেখ হাসিনা সরকার পাবত্য চট্টগ্রাম চুক্তির কিছু বিষয় যেমন- চুক্তি অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইন ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন প্রণয়ন; আঞ্চলিক পরিষদ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন; ভারত থেকে জুম্ম শরণার্থীদের প্রত্যাবাসন; চুক্তি মোতাবেক পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটি এবং ভূমি কমিশন ও টাস্কফোর্স গঠন ইত্যাদি বিষয়গুলো বাস্তবায়ন করেছে। কিন্তু পরবর্তীতে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার আবার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর প্রায় ছয় বছর অতিক্রান্ত হলেও কতিপয় বিষয় বা কর্ম তিন পার্বত্য জেলা পরিষদে হস্তান্তর ব্যতীত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির অবাস্তবায়িত বিষয়সমূহ বাস্তবায়নে কোন কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেনি।

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির মৌলিক বিষয়সমূহের মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় অধ্যুষিত অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ; পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের আওতাধীন বিষয় ও কার্যাবলী কার্যকরকরণ এবং এসব পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিতকরণ; পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন ২০০১-এর বিরোধাত্মক ধারা সংশোধন পূর্বক পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তিকরণ; আভ্যন্তরীণ জুম্ম উদ্বাস্তু ও প্রত্যাগত জুম্ম শরণার্থীদের জায়গা-জমি প্রত্যর্পণ ও তাদের স্ব স্ব জায়গা-জমিতে পুনর্বাসন; সেনা শাসন ‘অপারেশন উত্তরণ’সহ সকল অস্থায়ী ক্যাম্প প্রত্যাহার; অস্থানীয়দের নিকট প্রদত্ত ভূমি ইজারা বাতিলকরণ; পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল চাকুরীতে জুম্মদের অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে তিন পার্বত্য জেলার স্থায়ী অধিবাসীদের নিয়োগ; চুক্তির সাথে সামঞ্জস্য বিধানের জন্য অন্যান্য সংশ্লিষ্ট আইনসমূহ সংশোধন; সেটেলার বাঙালিদেরকে পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে সম্মানজনকভাবে পুনর্বাসন ইত্যাদি বিষয়গুলো বাস্তবায়নে সরকার কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি।

বর্তমান মহাজোট সরকারের পূর্ববর্তী মেয়াদে (২০০৯-২০১৩) চুক্তির পূর্বে হস্তান্তরিত বিষয়/বিভাগের অধীন ৭টি কর্ম এবং বর্তমান মেয়াদে ২০১৪ সালে জুম চাষ, মাধ্যমিক শিক্ষা, জন্ম-মৃত্যু ও অন্যান্য পরিসংখ্যান, মহাজনী কারবার ও পর্যটন (স্থানীয়)- এই পাঁচটি বিষয় তিন পার্বত্য জেলা পরিষদে হস্তান্তরিত হয়েছে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ অন্যান্য বিষয়সমূহ যেমন- জেলার আইন-শৃঙ্খলা তত্ত্বাবধান, সংরক্ষণ ও উহার উন্নতি সাধন; ভূমি ও ভূমি ব্যবস্থাপনা; পুলিশ (স্থানীয়); সরকার কর্তৃক রক্ষিত নয় এই প্রকার বন সম্পদ উন্নয়ন ও সংরক্ষণ; পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন; পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ ব্যতীত ইম্প্রুভমেন্ট ট্রাস্ট ও অন্যান্য স্থানীয় শাসন সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠান; মাতৃভাষার মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষা ইত্যাদি বিষয়সমূহ এখনো হস্তান্তর করা হয়নি। আরো উল্লেখ্য যে, যেসব বিষয় বা কর্ম/প্রতিষ্ঠান হস্তান্তরিত হয়েছে সেগুলোও ত্রুটিপূর্ণভাবে হস্তান্তর করা হয়েছে। যেমন- গত ২৮ আগস্ট ২০১৪ পর্যটন (স্থানীয়) বিষয়টি পর্যটন মন্ত্রণালয় ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের মধ্যকার চুক্তির মাধ্যমে হস্তান্তরিত হয়েছে। কিন্তু পর্যটন বিষয়টি যথাযথভাবে হস্তান্তরিত হয়নি।

উক্ত চুক্তিতে পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যাপারে পার্বত্য জেলা পরিষদের এখতিয়ার সীমিত রেখে পার্বত্য চট্টগ্রামে পর্যটন মন্ত্রণালয়সহ পর্যটন কর্পোরেশন, স্থানীয় সরকারি কর্তৃপক্ষ ও প্রাইভেট সেক্টর নিজস্বভাবে ইকো-ট্যুরিজম-এর পরিবর্তে কমার্শিয়াল পর্যটন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে পারবে।

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,
সরকার একদিকে যেমন পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির মৌলিক বিষয়গুলো বাস্তবায়নে তালবাহানা করে চলেছে, অন্যদিকে তেমনি চুক্তি বাস্তবায়ন বিষয়ে দেশে-বিদেশে অসত্য, বিভ্রান্তিমূলক ও মনগড়া বক্তব্য প্রচার করে আসছে। প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের অনেক মন্ত্রী-আমলারা প্রচার করে আসছেন যে, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির মোট ৭২টি ধারার মধ্যে ৪৮টি ধারা ইতিমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে এবং অবশিষ্ট ধারাগুলোর মধ্যে ১৫টি ধারার আংশিক বাস্তবায়ন হয়েছে এবং বাকি ৯টি ধারার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

বস্তুত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন বিষয়ে সরকারের উক্ত বক্তব্য বা প্রতিবেদন সর্বাংশে সত্য নয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মূল্যায়নে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির সর্বমোট ৭২টি ধারার মধ্যে মাত্র ২৫টি ধারা বাস্তবায়িত হয়েছে। আর অবাস্তবায়িত রয়েছে ৩৪টি ধারা এবং আংশিক বাস্তবায়িত হয়েছে ১৩টি ধারা। তার অর্থ হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির দুই-তৃতীয়াংশ ধারা এখনো অবাস্তবায়িত অবস্থায় রয়েছে। বাস্তবায়িত ২৫টি ধারার মধ্যে উপজাতি শব্দটি বলবৎ রাখা, পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদের পরিবর্তে পার্বত্য জেলা পরিষদ নামকরণ করা, ডেপুটি কমিশনারের পরিবর্তে সার্কেল চীফ শব্দগুলি প্রতিস্থাপন করা, চেয়ারম্যানের পদ শূণ্য হলে বা অনুপস্থিতির ক্ষেত্রে পরিষদের সভায় একজন উপজাতীয় সদস্যের সভাপতিত্ব করা, পরিষদের কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ, সরকার শব্দের পরিবর্তে ক্ষেত্র বিশেষে পরিষদ বা মন্ত্রণালয় শব্দটি প্রতিস্থাপন করা, পার্বত্য জেলা পরিষদ আইনের ৭০ ধারা বাতিল করা, জনসংহতি সমিতির সদস্যদের অস্ত্র জমাদান ইত্যাদি বিষয়গুলো উল্লেখ করা যেতে পারে। কিন্তু চুক্তির মৌলিক বিষয়গুলো অবাস্তবায়িত অবস্থায় রেখে দেয়া হয়েছে।

উদাহরণ হিসেবে ‘ক’ খন্ডের ধারা ১, ২, ৩ ও ৪ সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়িত হয়েছে বলে সরকার যে দাবি করছে সেই বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করলে সরকারের অসত্য বক্তব্যের চিত্র ফুটে উঠবে। জনসংহতি সমিতির মতে উক্ত চারটি ধারার মধ্যে প্রথম তিনটি ধারা এখনো অবাস্তবায়িত অবস্থায় রয়েছে। এই তিনটি ধারা কেবল অবাস্তবায়িত অবস্থার মধ্যে রেখে দেয়া হয়নি, কোন কোন ক্ষেত্রে সরকার চরমভাবে লঙ্ঘন করে চলেছে। প্রথমত: চুক্তির ‘ক’ খন্ডের ১নং ধারার অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলকে উপজাতি অধ্যুষিত অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু এই বিধান এখনো কাগজ-কলমের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে। উপজাতি অধ্যুষিত অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণের কোন আইনী বা কার্যগত সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। সরকারের কোন অফিস আদেশ, দিক-নির্দেশনা বা প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়নি। ফলে নানা কায়দায় পার্বত্য চট্টগ্রামে অব্যাহতভাবে বহিরাগতদের অভিবাসন ঘটছে এবং পাহাড়ি (উপজাতি) অধ্যুষিত অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য বা মর্যাদা ক্ষুন্ন হতে বসেছে।

দ্বিতীয়ত: ২নং ধারায় “যথাশীঘ্র ইহার বিভিন্ন ধারায় বিবৃত ঐক্যমত্য ও পালনীয় দায়িত্ব অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট আইন, বিধানাবলী, রীতিসমূহ প্রণয়ন, পরিবর্তন, সংশোধন ও সংযোজন আইন মোতাবেক করা হবে” মর্মে যে বিধান রয়েছে তদনুযায়ী ১৯৯৮ সালে তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইন প্রণয়ন করা হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রযোজ্য অন্যান্য আইনসমূহ এখনো চুক্তির এই ধারা মোতাবেক পরিবর্তন, সংশোধন ও সংযোজন করা হয়নি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় যে, বাংলাদেশ পুলিশ আইন, বন আইন, স্থানীয় সরকার পরিষদ (ইউনিয়ন পরিবষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা) আইন, ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি, ডেপুটি কমিশনারের দায়িত্ব ও ক্ষমতা সংক্রান্ত বিধিবিধান ইত্যাদি সংশোধন করা হয়নি। উল্লেখিত তথ্য থেকে উক্ত দু’টি ধারা সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়নের যে দাবি সরকার করছে তার অন্তসারশূণ্যতা সহজেই ফুটে উঠে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ‘খ’ খন্ডের তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের ৩৫টি ধারার মধ্যে ৬টি ধারা [৪(ঘ), ৯, ১৯, ২৪, ২৭ ও ৩৪ ধারা] ব্যতীত বাকী ২৯টি ধারা সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়িত হয়েছে বলে সরকার দাবি করছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তা সঠিক নয়।

১৯৯৮ সালে তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন সংশোধনের মাধ্যমে উন্নয়ন সংক্রান্ত ১৯নং ধারা ব্যতীত যদিও ‘খ’ খন্ডের অন্যান্য সকল ধারা তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের আইনে যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, কিন্তু আইনে অন্তর্ভুক্ত হওয়া মানেই তা সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়িত হয়েছে বলে দাবি করা যুক্তিযুক্ত হতে পারে না। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের পর ১৭ বছরেও এখনো তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। ৩৪-সদস্য বিশিষ্ট নির্বাচিত পার্বত্য জেলা পরিষদ গঠনের পরিবর্তে এখনো অনির্বাচিত বা সরকার কর্তৃক মনোনীত ৫ সদস্যক অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদ দিয়ে এসব তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ অগণতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে। কাজেই যেখানে আইনের প্রয়োগ নেই, সেখানে এ বিধানগুলো সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়িত হয়েছে বলে দাবি করা কখনোই সঠিক হতে পারে না। বস্তুত: জনমতকে বিভ্রান্তি করার হীন উদ্দেশ্যেই এভাবে বিভ্রান্তিকর, বাস্তব-বিবর্জিত ও মনগড়া দাবি করা হচ্ছে বলে বলা যেতে পারে।

এছাড়া সরকার যেসব ধারা আংশিক বাস্তবায়িত হয়েছে বলে দাবি করছে সেসব ধারাগুলোর মধ্যে সার্কেল চীফ কর্তৃক স্থায়ী বাসিন্দার সনদপত্র প্রদান সংক্রান্ত ৪(ঘ) নং ধারা, স্থায়ী বাসিন্দাদের নিয়ে তিন পার্বত্য জেলার ভোটার তালিকা প্রণয়ন সংক্রান্ত ৯নং ধারা; উন্নয়ন সংক্রান্ত ১৯নং ধারা; পার্বত্য জেলা পুলিশ গঠন সংক্রান্ত ২৪নং ধারা; জেলার এলাকাধীন বন্দোবস্তযোগ্য জমিসহ কোন জায়গা-জমি পার্বত্য জেলা পরিষদে পূর্বানুমোদন ব্যতীত ইজারা প্রদান, বন্দোবস্ত, ক্রয়-বিক্রয়, হস্তান্তর ও অধিগ্রহণের উপর বিধিনিষেধ সংক্রান্ত ২৬নং ধারা; ভূমি উন্নয়ন কর আদায় সংক্রান্ত ২৭নং ধারা এবং পার্বত্য জেলা পরিষদের কার্য ও দায়িত্বাবলী সংক্রান্ত ৩৪নং ধারা আংশিক বাস্তবায়িত হওয়ার দাবিও সর্বাংশে সঠিক নয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের ভোটার তালিকা বিধিমালা বা নির্বাচন বিধিমালা যেখানে এখনো প্রণীত হয়নি, সেখানে ভোটার তালিকা প্রণয়নের বিষয়টি আংশিক বাস্তবায়িত হয়েছে বলে দাবি করা বাতুলতা বৈ কিছু নয়।

পার্বত্য জেলা পুলিশ বিষয়টিও এখনো পার্বত্য জেলা পরিষদের নিকট হস্তান্তর করাই হয়নি, সেখানে পার্বত্য জেলা পরিষদ কর্তৃক জেলা পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর ও তদনিম্ন স্তরের সকল সদস্য নিয়োগ, বদলি ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের প্রশ্নই আসে না। তাহলে কোন অর্থে সরকার এ বিষয়গুলো আংশিক বাস্তবায়িত হয়েছে বলে দাবি করছে? মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে অসত্য, বিভ্রান্তিমূলক ও মনগড়া বক্তব্য প্রচার করে দেশ-বিদেশের জনমতকে বিভ্রান্ত করা। এমন কতগুলো বিষয় রয়েছে যেগুলো সরকার সম্পূর্ণ বা আংশিক বাস্তবায়িত হয়েছে বলে দাবি করছে সেগুলো কার্যত বাস্তবায়ন তো হয়ই নি, উপরন্তু চরমভাবে লঙ্ঘন করে চলেছে।

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,
সরকার কেবল চুক্তির মৌলিক বিষয়গুলো বছরের পর বছর ধরে অবাস্তবায়িত অবস্থায় রেখে দিয়ে কিংবা চুক্তি বাস্তবায়ন সম্পর্কে অসত্য, বিভ্রান্তিমূলক ও মনগড়া তথ্য দিয়ে অপপ্রচার চালিয়ে ক্ষান্ত থাকেনি, অধিকন্তু চুক্তি বাস্তবায়নের দোহাই দিয়ে চুক্তি পরিপন্থী ও জুম্মস্বার্থ বিরোধী আইন প্রণয়ন ও কার্যক্রম হাতে নিয়ে চলেছে। চুক্তির অবাস্তবায়িত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো বাস্তবায়নের উদ্যোগ না নিয়ে সরকার উল্টো পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি লঙ্ঘন করে এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পর্কে বা পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রযোজ্য কোন আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের সাথে আলোচনাক্রমে এবং পরামর্শ করে আইন প্রণয়নের যে বিধান রয়েছে সেই আইনী বিধিব্যবস্থাকে পদদলিত করে একতরফাভাবে তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন সংশোধন ও পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড আইন প্রণয়ন এবং রাঙ্গামাটিতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং মেডিকেল কলেজ স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে।

তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত না করে সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও স্থানীয় জনগণের মতামতের বিপরীতে অন্তর্বর্তীকালীন তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের আকার চেয়ারম্যানসহ ৫ সদস্য থেকে ১৫ সদস্যে বৃদ্ধি করে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গত ১৭ নভেম্বর ২০১৪ জাতীয় সংসদে তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ (সংশোধন) আইন ২০১৪ উত্থাপন করেছে এবং জাতীয় সংসদে গত ২৩ নভেম্বর উক্ত তিনটি বিল পাশ করা হয়েছে। জনমতের বিপরীতে পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন সংশোধনের মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের নির্বাচনকে অব্যাহতভাবে পাশ কাটানো, পার্বত্য জনগণের ভোটাধিকার ও প্রতিনিধিত্বের মতো রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখা, সর্বোপরি পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নকে সুকৌশলে এড়িয়ে যাওয়া।

অনুরূপভাবে সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের মতামতকে উপেক্ষা করে গত ১ জুলাই ২০১৪ জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড আইন ২০১৪ পাশ করেছে। এই আইনের মধ্য দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডকে একটি সংবিধিবদ্ধ সংস্থায় রূপান্তর করা হয়েছে। বস্তুত পার্বত্য চট্টগ্রামের বিশেষ শাসনব্যবস্থার মূল প্রতিষ্ঠানসমূহ হচ্ছে জেলা পর্যায়ে তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ এবং অঞ্চল পর্যায়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ। পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড আইন ২০১৪ প্রণয়নের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ সম্বলিত পার্বত্য চট্টগ্রামের বিশেষ শাসনব্যবস্থার কাঠামোকে নি:সন্দেহে ক্ষুন্ন করেছে এবং প্রশাসন ও উন্নয়নে জটিলতা সৃষ্টি করবে।

একইভাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও পার্বত্যবাসীর মতামতকে পদদলিত করে সরকার অতি সম্প্রতি রাঙ্গামাটিতে একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং একটি মেডিকেল কলেজ স্থাপনেরও উদ্যোগ নিয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সাথে কোনরূপ আলোচনা বা পরামর্শ ছাড়াই ২০০১ সালে সরকার “রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০০১” প্রণয়ন করে। সরকার উক্ত বিশ্ববিদ্যালয় আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিশেষ শাসনব্যবস্থা, স্বাতন্ত্র্যতা, জাতিবৈচিত্র্যতা, পশ্চাদপদতা, ভূমি সমস্যা ইত্যাদি প্রেক্ষাপটের কথা বিন্দুমাত্র আমলে নেয়নি। স্বাভাবিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়-মেডিকেল কলেজ সম্পর্কিত আইন ও নীতিমালা অনুসারে ছাত্রছাত্রী ভর্তি করা হলে ৯০% এর অধিক আসনে বহিরাগত ছাত্রছাত্রী ভর্তি হয়ে থাকবে।

এছাড়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজে শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে একই অবস্থা সৃষ্টি হবে। এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়-মেডিকেল কলেজ বহিরাগতদের অনুপ্রবেশ কেন্দ্রে পরিণত হবে এবং পরিণতিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি অধ্যুষিত অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য ও মর্যাদাকে মারাত্মকভাবে ক্ষুন্ন করবে। বস্তুত পার্বত্য চট্টগ্রামে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বহিরাগতদের ক্রমাগত অভিবাসন ও ভূমি বেদখল হওয়ার কারণে জুম্মদের জীবন-জীবিকা, পেশা ও ভূমি সংকট অত্যন্ত প্রকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং মেডিকেল কলেজ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে পার্বত্য অঞ্চলের অধিবাসীদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিরাজমান সমস্যাদি আরো জটিলতর হবে তাতে কোন সন্দেহ নেই।

বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এভাবেই পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বিরোধী ও পার্বত্যাবাসীর আশা-আকাক্সক্ষার বিপরীতে এই অগণতান্ত্রিক ও জনবিরোধী আইন প্রণয়ন ও কার্যক্রম গ্রহণের ফলে, সর্বোপরি আদিবাসী জুম্মদের অধিকার ও অস্তিত্বকে বিপন্নতার দিকে ঠেলে দেয়া হলে এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে এভাবে সরকারের তালবাহানার নীতি অব্যাহত থাকলে তার জন্য সরকারকেই চরম খেসারত দিতে হবে তাতে কোন সন্দেহ নেই।

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,
সম্প্রতি পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন পার্বত্য জেলায় জুম্মদের আবাসভূমি ও ধর্মীয় স্থানসহ রেকর্ডীয় ও ভোগদখলীয় ভূমি বেদখল এবং স্বভূমি থেকে তাদেরকে উচ্ছেদের ষড়যন্ত্র ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বেসরকারি নানা উদ্যোগের পাশাপাশি বিশেষ করে সরকারি বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে এই বেদখলের প্রক্রিয়া জোরদার করা হয়েছে। বিশেষ করে সেনাক্যাম্প স্থাপন ও সম্প্রসারণের পাশাপাশি সম্প্রতি বৃদ্ধি পেয়েছে যত্রতত্র বিজিবি ক্যাম্প স্থাপন ও সম্প্রসারণের তৎপরতা। এর সাথে পাল্লা দিয়ে আদিবাসী জুম্মদের আবাসভূমি, জুমভূমি, ভোগদখলীয় ও বিচরণভূমিতে অহরহ গড়ে তোলা হচ্ছে বিভিন্ন পর্যটন স্পট, রিসোর্ট, রেস্টুরেন্ট, বিলাসবহুল মোটেল ইত্যাদি নানা বিনোদন ও বাণিজ্য কেন্দ্র। এতে অনেক আদিবাসী জুম্ম পরিবার হয় ইতোমধ্যে নিজের বাস্তুভিটা ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে, নতুবা অনেকেই উচ্ছেদের মুখে রয়েছে।

জুম্মদের জায়গা-জমির উপর বিজিবি ক্যাম্প স্থাপনের উদ্যোগের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে দীঘিনালা উপজেলার বাবুছড়ায় ২১টি জুম্ম পরিবারকে উচ্ছেদ করে এবং একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় দখল করে বিজিবির ব্যাটেলিয়ন সদর দপ্তর স্থাপনের উদ্যোগ; রোয়াংছড়ি উপজেলার বান্দরবান-রোয়াংছড়ি সড়কে অবস্থিত হ্লাপাইক্ষং মৌজাধীন ক্রাইক্ষ্যং পাড়া ও হাংসামা পাড়ায় মারমা অধিবাসীদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও শ্মশানের জায়গাসহ ভোগদখলীয় ও বন্দোবস্তীর জন্য প্রক্রিয়াধীন জায়গার উপর বিজিবি সেক্টর হেডকোয়ার্টার স্থাপনের উদ্যোগ; রুমা উপজেলার পাইন্দু মৌজা ও পলি মৌজার পাইন্দু পাড়া, চান্দু পাড়া ও চাইপো পাড়ার প্রায় ৫০০ মারমা পরিবারকে উচ্ছেদ করে বিজিবি ক্যাম্প স্থাপনের উদ্যোগ; মাটিরাঙ্গা উপজেলার ওয়াসু মৌজার চালতাছড়ায় জুম্মদের উচ্ছেদ করে একটি বিজিবি ক্যাম্প স্থাপনের উদ্যোগ।

সেনাবাহিনী কর্তৃক জুম্মদের জায়গা-জমির উপর পর্যটন স্পট, রিসোর্ট, মোটেল ইত্যাদি নানা বিনোদন ও বাণিজ্য কেন্দ্র স্থাপনের মধ্যে বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেকের রুইলুই এলাকার দু’টি গ্রামের ৬৫টি জুম্ম পরিবার উচ্ছেদ করে পর্যটন কেন্দ্র স্থাপন; রুমা উপজেলায় বম অধিবাসীদের উচ্ছেদ করে অনিন্দ্য পর্যটন কেন্দ্র স্থাপন; বান্দরবান সদর উপজেলায় ডোলা ম্রো পাড়া (জীবন নগর), কাপ্রু পাড়া (নীলগিরি), চিম্বুক ষোল মাইল, ওয়াই জংশন (বারো মাইল) ও কেওক্রডং পাহাড়ে ৬০০ একর জায়গা দখল করে বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্র স্থাপন; রুমা জোনের সেনাবাহিনী কর্তৃক কেওক্রাডং-এর চূড়ায়ও পর্যটন কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ ইত্যাদি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পর্যটন বিষয়টি পার্বত্য জেলা পরিষদের আওতাধীন হলেও পরিষদের এখতিয়ারকে উপেক্ষা করে সেনাবাহিনী এসব পর্যটন কেন্দ্র বাস্তবায়ন করে চলেছে।

এছাড়া রুমা সেনানিবাসসহ ক্যাম্প সম্প্রসারণ ও প্রশিক্ষণ ঘাঁটি স্থাপনের জন্য কেবলমাত্র বান্দরবান পার্বত্য জেলায় ৭৫,৬৮৬ একর পাহাড়ভূমি অধিগ্রহণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সেনাবাহিনীর এসমস্ত পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে যুগ যুগ ধরে ঐ অঞ্চলে বসবাসকারী আদিবাসী জুম্মদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক জীবনে বিরূপ পরিস্থিতির সৃষ্টি করবে। বিশেষ করে এ অঞ্চলের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী  ম্রো ও বম জনগোষ্ঠী ক্ষতির সম্মুখীন হবে। বাঘাইছড়ির দ্বিটিলা এলাকায় ও গঙ্গরাম দোয়ারে প্রথাগত ভূমিতে বৌদ্ধ মূর্তি নির্মাণে সেনাবাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসন বাধা দিয়ে চলেছে।

অপরদিকে বনবিভাগ কর্তৃক পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি ও জুম্মদের প্রথাগত ভূমি অধিকারকে লঙ্ঘন করে রাঙ্গামাটি জেলায় ২০টি মৌজার ৮৪,৫৪২ একর মৌজাভূমি সংরক্ষিত বন ঘোষণার ষড়যন্ত্র চালানো হচ্ছে। উল্লেখ্য যে, সংরক্ষিত বনাঞ্চল গঠনের কার্যক্রমের অংশ হিসেবে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় ২৫ জুন ১৯৯০ থেকে ৩১ মে ১৯৯৮ তারিখের জারিকৃত বিভিন্ন গেজেট প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ২,১৮,০০০ (দুই লক্ষ আটার হাজার) একর জমি অধিগ্রহণের উদ্যোগ গ্রহণ করে। এসব জমির মধ্যে রয়েছে পাহাড়ি-বাঙালি স্থায়ী অধিবাসীদের বন্দোবস্তীকৃত বসতভিটা এবং ফল ও বনবাগানের জমি, বন্দোবস্তীর প্রক্রিয়াধীন জমি, প্রথাগত আইনের আওতায় মালিকানাধীন জুমভূমি ও ভোগদলীয় জমিসহ সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পের আওতাধীনে পুনর্বাসিত লোকজনের জমি। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে রাঙ্গামাটি জেলার শুকরছড়ি মৌজায় ৫০০ একর জায়গায় সংরক্ষিত বন ঘোষণা।

গত ৬ জুলাই ২০১৪ তারিখে রাঙ্গামাটি জেলার রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর কর্তৃক দাখিলকৃত প্রতিবেদনে উক্ত শুকরছড়ি মৌজায় প্রস্তাবিত জায়গায় ৪৬টি পরিবার যথাযথ প্রক্রিয়ায় বন্দোবস্তী পেয়ে বসবাস করছেন এবং বাকি ৪২টি পরিবার বন্দোবস্তীর জন্য আবেদন করেছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তারা বসতভিটা ছাড়াও বিভিন্ন প্রজাতির বনজ ও ফলজ বাগান সৃজন করেছেন এবং উক্ত এলাকায় দখলমুক্ত কোন জমি নেই বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। এভাবে বিভিন্ন মৌজায় জুম্মদের বসতি বা বাগান-বাগিচা থাকা সত্ত্বেও সংরক্ষিত বা রক্ষিত বন ঘোষণা করে জুম্মদের উচ্ছেদের ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে। উল্লেখ যে, রক্ষিত বন ব্যতীত অন্যান্য সকল বন যেমন- সংরক্ষিত ও অশ্রেণিভুক্ত বন পার্বত্য জেলা পরিষদের আওতাধীন বিষয়। তিন পার্বত্য জেলা পরিষদে এ বিষয়টি হস্তান্তর না করে বন বিভাগের কর্তৃত্বে রেখে সরকার জুম্মদের উচ্ছেদের ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে।

বিজিবি, সেনাবাহিনী বা বন বিভাগের পাশাপাশি বহিরাগত প্রভাবশালী ব্যক্তি, ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক নেতা, সামরিক-বেসামরিক আমলা কর্তৃক নির্বিচারে জায়গা-জমি জবরদখল চলছে। নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায় ২১টি চাক পরিবারকে উচ্ছেদ করে প্রাক্তন ইউপি চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ কর্তৃক জুমভূমি দখল; লামা উপজেলায় মো: আনিসুর রহমান ও মো: মোহসিন বাদল-এর নেতৃত্বে তথাকথিত লাদেন গ্রুপ কর্তৃক ৭৫টি ম্রো, ত্রিপুরা, মারমা ও স্থায়ী বাঙালি পরিবার উচ্ছেদ করে ১৭৫ একর জায়গা জবরদখল এবং মুজিবুল হক গং কর্তৃক মারমা গ্রামবাসীর উপর হামলা চালিয়ে প্রায় ৫০০ একর জায়গা দখলের অপচেষ্টা; রোয়াংছড়ি উপজেলায় মো: সামাদ আলী নামে জনৈক বহিরাগত বাঙালি কর্তৃক ৩৩টি মারমা পরিবারের রেকর্ডীয় জমি জালিয়াতির মাধ্যমে বন্দোবস্তকরণ ও জবরদখলের অপচেষ্টা; আলিকদম উপজেলায় বদিউল আলম গং কর্তৃক ম্রো, ত্রিপুরা ও মারমা পরিবারের প্রায় ১,০০০ একর রেকর্ডীয় ও ভোগদখলীয় জমি জবরদখল ইত্যাদি ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখ করা যেতে পারে। এভাবে প্রশাসনের ছত্রছায়ায় ভূমি আগ্রাসনের ফলে স্থানীয় পাহাড়ি-বাঙালি অধিবাসীরা চরম নিরাপত্তাহীনতা ও অনিশ্চিয়তার মধ্যে দিনাতিপাত করতে বাধ্য হচ্ছে।

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়িত না হওয়ার ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের সামগ্রিক পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক। সরকারের চুক্তি বাস্তবায়নে অব্যাহত গড়িমসি ও কায়েমী স্বার্থবাদীদের ষড়যন্ত্রের কারণে রাষ্ট্রযন্ত্রে বা রাষ্ট্রযন্ত্রের বাইরে ঘাপতি মেরে থাকা সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী গোষ্ঠী এবং উগ্র জাতীয়তবাদী শক্তি তাদের অপতৎপরতা বৃদ্ধি করেছে। চুক্তি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণভাবে নস্যাৎ করার লক্ষ্যে এসব অপশক্তি তিন পার্বত্য জেলায় সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী জঙ্গী তৎপরতা জোরদার করেছে। তারা পার্বত্য চট্টগ্রামকে পশ্চাদভূমি হিসেবে ব্যবহার করে সারাদেশে মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক জঙ্গী তৎপরতা বিস্তৃত করে চলেছে। তারা সাম্প্রদায়িক জিগির তুলে জুম্মদের উপর একের পর এক সাম্প্রদায়িক হামলা সংঘটিত করে চলেছে। তারই ধারাবাহিকতায় নিরাপত্তা বাহিনী ও প্রশাসনের ছত্রছায়ায় এ সরকারের আমলে অন্তত ৭টি সাম্প্রদায়িক হামলা সংঘটিত হয়েছে। গত ৩ আগস্ট ২০১৩ তারিখে সংঘটিত মাটিরাঙ্গা-তাইন্দং-এর সাম্প্রদায়িক হামলা হলো তার অন্যতম একটি ঘটনা। তারই ধারাবাহিকতায় গত ৫ জুলাই ২০১৪ রাঙ্গামাটিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক কমিশনের সফররত সদস্যদের উপর সেটেলার বাঙালিদের উগ্র সাম্প্রদায়িক সংগঠনের সন্ত্রাসী কর্তৃক নৃশংস হামলা করা হয়েছে।

অপরদিকে প্রশাসনের একটি বিশেষ মহলের ছত্রছায়ায় পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বিরোধী ইউপিডিএফ নামধারী সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ও সংস্কারপন্থী নামে খ্যাত বিপথগামী গোষ্ঠী অবাধে চাঁদাবাজি, অপহরণ, হত্যা ইত্যাদি সন্ত্রাস চালিয়ে যাচ্ছে। চুক্তি স্বাক্ষরের পর এযাবৎ এই চুক্তি বিরোধী ইউপিডিএফ ও সংস্কারপন্থী সন্ত্রাসীরা জনসংহতি সমিতির ৯৩ জন সদস্যসহ তিন শতাধিক লোককে খুন ও অসংখ্য নিরীহ লোককে অপহরণ ও নির্যাতন করেছে। সরকারের নির্লিপ্ততা তথা প্রকারান্তরে প্রত্যক্ষ মদদদানের কারণে সংস্কারপন্থী-ইউপিডিএফ এভাবে একের পর এক সশস্ত্র সন্ত্রাসী কার্যকলাপ চালিয়ে যেতে সক্ষম হচ্ছে।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আদিবাসী ও সংখ্যালঘুদের ভূমি জবরদখল ও তাদের চিরায়ত ভূমি থেকে উচ্ছেদ করার হীন উদ্দেশ্যে আদিবাসী ও সংখ্যালঘুদের উপর সাম্প্রদায়িক হামলা, নারীর উপর ধর্ষণ, হত্যা, অপহরণসহ নৃশংস সহিংসতা, নিপীড়ন-নির্যাতন বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে আদিবাসী নারীর উপর সহিংসতার মাত্রা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে। অতি সম্প্রতি সেপ্টেম্বর-নভেম্বর তিন মাসে পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং সমতল অঞ্চলে কমপক্ষে ১৬ জন আদিবাসী নারী যৌন ও শারিরীক সহিংসতা ও অপহরণের শিকার হয়েছে। গত আগস্টে বিচিত্রা তির্কির মতো একজন নির্বাচিত ইউপি সদস্য ও পদকপ্রাপ্ত জনপ্রতিনিধির উপর হামলা ও যৌন সহিংসতার ঘটনায় হামলাকারীরা নির্বিঘ্নে জেল থেকে ছাড়া পেয়েছে। যে কারণে আদিবাসীরা উদ্বিগ্ন না হয়ে পারে না।

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,
বর্তমানে সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির অবাস্তবায়িত মৌলিক বিষয়সমূহ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াকে অনিশ্চিয়তার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। সরকারের আলামত দেখে এটা স্পষ্ট বলা যায় যে, সরকার চুক্তি বাস্তবায়নের আর কোন কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করবে না। দেশ-বিদেশের জনমতকে বিভ্রান্ত করার জন্য বড়জোর বুলিতে চুক্তি বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে যাবে। আর চুক্তি বাস্তবায়নের নামে কোন কিছু উদ্যোগ নিলেও তা চুক্তি বাস্তবায়নের দোহাই দিয়ে চুক্তি পরিপন্থী বা জুম্ম স্বার্থ-বিরোধী কার্যক্রম হাতে নেবে; যার মূল লক্ষ্যই হলো আদিবাসী জুম্মদের জাতিগতভাবে নির্মূল করা আর অমুসলিম অধ্যুষিত পার্বত্য চট্টগ্রামকে মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে পরিণত করা।

পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা একটি জাতীয় ও রাজনৈতিক সমস্যা। বস্তুত দেশের সামগ্রিক স্বার্থেই এ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। তাই এ চুক্তি বাস্তবায়নে সরকারের দায়িত্ব ও কর্তব্যই হচ্ছে প্রধান। এমতাবস্থায় আর বিলম্ব না করে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির অবাস্তবায়িত বিষয়গুলো বাস্তবায়নে সময়সূচি ভিত্তিক কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি সরকারের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছে। অন্যথায় পার্বত্য চট্টগ্রামের যে কোন অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি জন্য সরকারই দায়ি থাকবে। সেই সাথে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি এই ঘোষণা করছে যে- আগামী ৩০ এপ্রিল ২০১৫-এর মধ্যে সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে সময়সূচি ভিত্তিক কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ না করলে ১ মে ২০১৫ সাল থেকে- (১) পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির নেতৃত্বে সরকারের বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলন শুরু করা হবে এবং (২) চুক্তি পরিপন্থী ও জুম্মস্বার্থ বিরোধী সকল কার্যক্রমের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক প্রতিরোধ আন্দোলন জোরদার করা হবে।

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,
আপনারা নিশ্চয় ইতিমধ্যে অবগত হয়েছেন যে, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ১৭তম বর্ষপূর্তি উপলক্ষ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির উদ্যোগে ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ তিন পার্বত্য জেলায় জেলা ও উপজেলা সদরে র‌্যালী, গণসমাবেশ ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আপনাদের মাধ্যমে পার্বত্যবাসীসহ দেশবাসীকে জনসংহতি সমিতির সেই কর্মসূচিতে সামিল হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।
আপনাদের সকলকে আন্তরিক ধন্যবাদ।

(জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা)
সভাপতি
পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি।

Print Friendly