জুম চাষীদের দুর্দিনঃ পাহাড়ে আগের মত ফলন নেই

পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী সম্প্রদায়ের চাষ পদ্ধতির মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী জুম চাষআদিবাসী সম্প্রদায় যুগ যুগ ধরে জুম চাষের মধ্য দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে আসলেও বর্তমানে যুগের পরিবর্তনের কারণে জুমে আগের মত ফলন হয় নাএর অন্যতম কারণ হচ্ছে মাটির উর্বরতা শক্তি কমে যাওয়াসর্বোপরী পার্বত্য চট্টগ্রামে জনসংখ্যা বেড়ে যওয়াফলে জুম চাষের সাথে নির্ভরশীল চাষীদের সারা বছর অত্যন্ত কষ্টের মধ্যে দিনাতিপাত করতে হয় জুম চাষের হালচাল নিয়ে সত্রং চাকমার প্রতিবেদন 

5

পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান এলাকায় বাসবাসকারী পাহাড়িদের একটি বড় অংশের আয়ের প্রধান উৎস জুম চাষ। জুম চাষের মাধ্যমে অর্জিত আয় দিয়েই তারা জীবিকা নির্বাহ করে। এ কারণে জুমের ফসল ওঠার সঙ্গে তাদের জীবন যাত্রারও পরিবর্তন ঘটে। আর কয়েকদিন পরই জুম চাষীদের ঘরে ঘরে নতুন ফসল উঠবে। কিন্তু এখন আর ফসল ওঠার সঙ্গে তারা আন্দোলিত হতে পারে না। কারণ জুমের জমি ও উৎপাদন দুটোই কমে গেছে। উৎপাদিত ফসল দিয়ে তাদের এক বছরের খোরাকও জোটে না। সারা বছর তাদের অভাব অনটনের মধ্যে দিয়ে চলতে হয়। তাই বাধ্য হয়ে অনেক পাহাড়িরা এখন বিকল্প আয়ের সন্ধানে ব্যস্ত। একই জমিতে প্রতিবছর জুম চাষের ফলে পাহাড়ের উর্বরতা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, অপরিকল্পিতভাবে সার প্রয়োগ করে জমির উৎপাদনশীলতা নষ্ট হচ্ছে, জুম ধানের বীজের অভাব, বিভিন্ন পাহাড়কে সংরতি অঞ্চল ঘোষনা, সরকারি অফিস আদালত নির্মান, প্রতিবছর কমছে জমির পরিমাণ-এসব কারণে জুম চাষ থেকে পাহাড়িরা আর আগের মত ফসল পাচ্ছে না। এছাড়া জুম চাষের কারণে পাহাড় ধ্বংস, পরিবেশ দূষন হচ্ছে এসব অজুহাতে জুম চাষ নিষপন্ন করার চেষ্টা চলছে। তাই এসব কারণে অর্থনৈতিকভাবে মার খেতে খেতে প্রান্তিক জুম চাষীদের জীবন এখন বিপন্ন।

জুম চাষ কি : পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ের পাদদেশে গাছ-গাছালি কেটে আগুনে পুড়িয়ে জমিতে যে চাষ করা হয় তার নাম হচ্ছে জুম চাষ। জুম চাষ পাহাড়িদের একটি ঐতিহ্যবাহী প্রথা হলেও এটি একটি জীবন জীবিকার উৎসও বটে। কারণ যুগ যুগ ধরে পাহাড়িরা এই সনাতন পদ্ধতিতে পাহাড়ের উপর চাষাবাদ করে আসছে। এর মাধ্যমে প্রাপ্ত ফসল দিয়েই তারা জীবিকা নির্বাহ করছে। জুষ চাষের মাধ্যমে পাহাড়িরা ধান, শাকসবজি, ফল উৎপাদন করে।

জুম চাষের ইতিহাস : ১৮১৮ সালের আগে পার্বত্য চট্টগ্রামে জুম চাষই ছিল একমাত্র কৃষি চাষ পদ্ধতি। সে সময় এ অঞ্চলের লোকসংখ্যা ছিল কম। সে জন্য তখনকার সময় পাহাড়িরা দীর্ঘ এলাকা জুড়ে জুমের জুম চাষ করতে পারতো। ফলনও হতো ভালো। বনজ সম্পদ রার উদ্দেশ্য বৃটিশ সরকার সতল ভূমিতে চাষাবাদ শুরু করার উদ্যোগ গ্রহন করে। ১৮৬০ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসতবাড়ির খাজনা প্রথা চালু করা হয়। ১৮৭০ সালে এটিকে জুম চাষ খাজনা হিসাবে অভিহিত করা হয়। এতে মাথাপিছু চার টাকা জুম খাজনা থেকে সরকারী তহবিলে জমা হতো এক টাকা। দুই টাকা রাজা ও এক টাকা খাজনা আদায়কারী দেওয়ান বা হেডম্যানরা পেতেন।

1জুম চাষের অবস্থান ও জমির পরিমান: দেশের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে অবস্থিত সবুজ পাহাড় বেষ্ঠিত বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম (রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান) জেলা। যার আয়তন হচ্ছে ১৩২৯৫বর্গ কিলোমিটার। এই তিন পার্বত্য জেলায় ১০ ভাষাভাষি ১১টি (চাকমা,মারমা, ত্রিপুরা, চাক, বম, খিয়াং, ম্রো, তংচংগ্যা, পাংখো, লুসাই ও খূমী ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পাহাড়ী জনগোষ্ঠীদের বসবাস। কৃষি বিভাগের মতে, তিন পার্বত্য জেলা রাঙামাটি,খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে অবস্থিত ৫ হাজার ৪৮০ বর্গকিলোমিটার অশ্রেনীভুক্ত বনভূমির সিংহভাগেই জুম চাষ করা হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় ৩৪ হাজার পরিবার এখনো জুম চাষ নির্ভর জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত। এর মধ্যে খাগড়াছড়িতে প্রায় ১২হাজার, রাঙামাটিতে প্রায় ১০হাজার ও বান্দরবাসে প্রায় ১৩হাজার জুমিয়া (জুমচাষী) রয়েছে।
এশিয়া উন্নয়ন ব্যাংকের(এডিবি) এক জরিপে দেখা গেছে, পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত পাহাড়ী জনগোষ্ঠীদের মধ্যে শতকরা ৮০ শতাংশ জুম চাষের উপর নির্ভশীল। পাহাড়ি জনগোষ্ঠী প্রাচীন কাল থেকে সনাতন পদ্ধতিতে জুম চাষ করে আসছে। পাহাড়িদের জীবন যাত্রার মান উল্পুয়নে এডিবি জুম চাষের পরিবর্তে তাদেরকে অন্য পেশায় উৎসাহিত করার একটি প্রকল্প নিলেও তা সফল হয়নি।

সম্প্রদায় ভিত্তিক জুম চাষীর সংখ্যাঃ বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা ব্রাকের এক গবেষনায় জানা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রামের পাচঁটি প্রধান সম্প্রদায়ের মধ্যে চাকমা ২২ দশমিক ৭, ত্রিপুরা ৫৪ দশমিক ৮, মারমা ৪২ দশমিক ৩, ম্রো ৮৬ দশমিক ৪ এবং বাঙালী ১ দশমিক ৬ শতাংশ জনগোষ্ঠী জুম চাষের সঙ্গে জড়িত।
জুম চাষ অন্য দেশে : জুম চাষ শূধু পার্বত্য চট্টগ্রামে হচ্ছে না। পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও জুম চাষ হয়। এর মধ্যে ফিলিপাইন, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যেসমূহ, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, মধ্য আমেরিকা, ইন্দোনেশিয়া, ব্রাজিল, নেপাল ও অফ্রিকায়। ওইসব দেশের বিশেষ করে আদিবাসী জনগোষ্ঠী এ চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করে। জুম চাষের বিভিন্ন নাম পার্বত্য চট্টগ্রামের বসবাসরত পাহাড়ি সম্প্রদায় জুম চাষকে বিভিন্ন নামে অভিহিত করে। চাষ পব্দতি একই। বাংলায় জুম চাষকে কৃষি বিজ্ঞানীরা স্থানান্তরিক চাষ বলে অভিহিত করেছেন। কারণ এ চাষ পব্দতি প্রতি বছর এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ে স্থানান্তরিত হয়। চাকমা ভাষায় ‘জুম’, মারমা ভাষায় ‘ইয়াঁ’, ত্রিপুরা ভাষায় ‘হুগ’, ম্রোর ভাষায় ‘উঃঅ’, খিয়াংর ভাষায় ‘লাই’ বম ভাষায় ‘লাও’ এবং চাক ভাষায় ‘ইপপ্রা’ বলে থাকে।

জুম চাষের পরিবর্তন :  জুম চাষীরা ধান, তিল, বেগুন, আদা, হলুদ, কলা, পেঁপেসহ বিভিন্ন ধরনের ফল ও সবজির চাষ করলেও সময়ের পরিবর্তনে জুম চাষ পদ্ধতি ও পরিবর্তন এসেছে। এখন জুম চাষীরা বেশি ফসল উৎপাদন করতে জমিতে সার, কীটনাশক ব্যবহার করছেন। বছরে একাধিক চাষ করছেন। একই সঙ্গে ফলছেন একাধিক সবজি বা ফল। পাহাড়ি জমিতে সাধারণত এক বার চাষ করা হলে পরের বছর আর ভাল ফলন ফলে না। এ জন্য চাষীরা এখন আর আগের মত ভাল ফলন পাচ্ছে না। এছাড়া জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় জনপ্রতি জুম চাষের জমির পরিমাণ কমে যাচ্ছে।

জুমের ধান:  জুম চাষীরা বর্তমানে মেরি ধান বা কামরাং ধান বেশী বপণ করে থাকে। কারণ জুমে এই ধরনের ধানের ভালো ফলন পাওয়া যায়। এছাড়াও জুম চাষীরা কবরক, গেলং, গুড়ি চিনেল, রাঙা গেলং, রেঙ্গই, মুম্বই ও কোম্মোনী ধান চাষ করে। জুমে যেসব ধানের চাষা করা হয় তার সঙ্গে সমতল ভূমির ধানের ছেড়ে এগুলোর স্বাদ ও গন্ধ আলাদা। জুমের যে ধান উৎপন্ন হচ্ছে সেগুলো সুগন্ধি এবং আঠালো। এই ধানের চাল দিয়ে বিভিন্ন স্বাদের খাবার, পায়েসহ ইত্যাদি মজাদার খাবার বানানো যায়।

2জুমের ফসল :  জুমে ধানের বীজ বপণ করার সময় শাক-সব্জির মধ্যে ভূট্টা, মারপা, মরিচ, বেগুন, শসা, শিম, তিল, ঢেঁড়স, মিষ্টি কুমড়া, ঝিঙে, করলা, ফোরল, পাহাড়ি আলু, শাবারাং (এক প্রকার সুগন্ধিযুক্ত সবব্জি) জুমিয়া কচু। এছাড়াও জুম চাষীরা আর্থিক লাভের আশায় তূলা, হলুদ ও সত্রং ফূলের (গাঁদা ফূল) চাষ করে।

জুম ঘর যেন নতুন স্বপ্নঃ বীজ বোনা ও বীজের চারা গোজাতে শুরু করলে জুমিয়ারা জুমের এক অংশে সুবিধামত জুম ঘর(মাচাং ঘর) তৈরীতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। জুমঘর তৈরী শেষ হলে তারা পরিবার নিয়ে বসবাস শুরু করে দেয়। এর পর জুমের ধান গাছগুলো সবুজ হয়ে উঠে। তখন জুম চাষীর মনে একটু হাসির আভা ফুটে উঠে। নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। যে স্বপ্ন শুধু পরবর্তী বছরের জন্য বেচেঁ থেকে নতুন করে যেন জুম চাষ করা যায়। কিছুদিন যাওয়ার পর জুমের ধানের ফসল বড় হলে আগাছা পরিষ্কার করার সময় আসে। এ সময় জুমিয়ারা নানা অভাব-অনটনে দিন কাটাতে হয়। অবশ্যই সে সময়টাতে জুমে উৎপাদিত মারফা, মরিচ ও নানা সব্জি পার্শ্ববর্তী বাজারে বিক্রি করে সংসার চালায়।

জুমের ফসল পাকার সময় : সাধারনত সেপ্টেম্বর-অক্টোবর(ভাদ্র-আশ্বিন) মাসে জুমের প্রধান ফসল ধান পেকে যায়। এসময় চাষীরা ঘরে ধান তূলতে খুবই ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ধান তোলার পর তূলা, হলুদ ও আলু সংগ্রহ করে বাজারে বিক্রি করে যে আয় হয় তা দিয়ে তারা সংসারের অন্যান্য প্রয়োজন মেটায়। এভাবে জুমিয়ারা পাহাড়ে এক জায়গা থেকে জুমের ফসল তোলা শেষ হওয়ার পর পরবর্তী বছরের জন্য চিন্তাভাবনা করে তাদের সংসার কোন রকমে কেটে ফেলে।

যে কারণে কমে যাচ্ছে জুম চাষ : জুম চাষীদের সঙ্গে কথা বলে জনা গেছে বর্তমানে পাহাড়ের উর্বরতা কমে গেছে। আগের মত আর জুমের ফলন হয় না। এছাড়া, জুম ধানের বীজের অভাব। অন্যদিকে জুমে ভালো ফলন পেতে হলে এখন পাহাড়ে কৃত্রিম জৈব সার প্রয়োগ করতে হয়। আবার সব চাষীদের সার কেনার মতা নেই এবং অনেকেই সার প্রযোগের ব্যাপারে ভালো কোন ধারনা নেই।

জুম চাষীদের কথা : জুমচাষী সত্যি চাকমা, ধন চান চাকমা, মুরদতে চাকমা জানান, তাদের এক বছরের খোরাকও জোটে না জুমের ফসল থেকে। এর কারণ হিসাবে তারা জানান সময় মত বৃষ্টি না হওয়া, জুমের ধানের বীজের অভাব, ধানে পোকামাকড়ের আক্রমণ ও মাটির উর্বরতা এখন আর আগের মত নেই। এতে ফলন কমে গেছে। বেঁচে থাকার তাগিদে তারা ঐতিহ্যবাহী জুম চাষ করতে বাধ্য হচ্ছে। চাষীরা জানান, জমি অপ্রতুলতা ও বিভিন্ন ধরণের বাধা আসে। জীবন ধারনের জন্য অন্য কোন ভালো কাজ পেলে তারা জুম চাষ ছেড়ে দেবে বলে জানায়। জুম চাষী মুরদতে চাকমা জানান, এ বছর জুমে ভালো ফলন আশা করা যাচ্ছে। এবারের তিনি দেড় একর জমিতে তিন আড়ি (২৫কেজি) কোম্মোনী ধান লাগিয়েছেন। তিনি জুমে দেড় কেজি সার প্রয়োগ করেছেন। জুমের ফসল দিয়ে এবছরের খোরাকও জুটে না। অত্যন্ত দুঃখ কষ্ট করে পরিবার চালাতে হয়।

3আগের মত জুমের পাহাড় উর্বরতা নেই:  অনুসন্ধানে জানা গেছে, আগের সময়ে পাহাড়ে জুম চাষের ফলন খুব ভালো হত। কিন্তু এখন পাহাড়ের উর্বরতা শক্তি কমে গেছে। অনেক জুম চাষী রয়েছে তাদের জুমের মধ্যে সার প্রয়োগের ব্যাপারে কোন অভিজ্ঞতা নেই। সনাতন পদ্ধতিতে জুমিয়ারা জমি চাষযোগ্য করার জন্য পাহাড়ে নির্বাচিত অংশে গাছ লতাগুল্ম পরিষ্কারভাবে কেটে ফেলে তা কিছু দিন রোদে শুকিয়ে অত্যন্ত সুকৌশলে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং ওই লতাগুল্ম আগুনে পুড়ে ছাই হয়। এই ছাই জুমে সার হিসেবে কাজে আসে। কিন্তু বর্তমানে এসব দিন পাল্টে গেছে। জুম চাষীদের জীবনে নেমে এসেছে এখন বড়ই দুর্দিন। এর কারণ তথ্যনুসন্ধানে জানা গেছে, বহিরাগত জনসংখ্যার চাপ, সেনা বাহিনীর ছাউনী নির্মান, জুমের জমি সংকূচিত ও পাহাড়ের উর্বরতা নষ্ট হওয়া, বিকল্প আয়ের অভাব, চার দশক ধরে জুম নিয়ন্ত্রণের নামে বনবিভাগের মিথ্যা মামলাসহ নানা হয়রানি। এসব কারণে অর্থনৈতিকভাবে মার খেতে খেতে প্রান্তিক জুম চাষীদের জীবন এখন বিপন্ন।

জুম নিয়ন্ত্রন বন বিভাগ ভুমিকা নিয়ে প্রশ্ন:  জুম নিয়ন্ত্রন বন বিভাগ নামের বন বিভাগের একটি শাখা রয়েছে। এর প্রধান উদ্দেশ্যে হল পাহাড়ে জুম চাষ নিয়ন্ত্রন করার পাশাপাশি জুম চাষীদের ফলের বাগাণ বা বন বিভাগ কর্তৃক নির্ধারিত বৃ চাষ, রাবার বাগান প্রভৃতি দিকে উৎসাহিত করা। কিন্তু এই বিভাগটি নামে থাকলেও জুমিয়ারাদের কোন কাজে আসছে না বলে জানা গেছে। সূত্র মতে, পাহাড়ে জুম চাষের বিকল্প ও জুমিয়াদের পূর্ণবাসনের ব্যাপারে কোন বিকল্প কর্মসূচি আজও আলোর মূখ দেখা যায়নি। তবে অন্য একটি সূত্র বলছে পার্বত্যাঞ্চলে জুম চাষ বন্ধের জন্য সরকারী বিকল্প পথ হিসেবে জুমিয়া পূর্নবাসন প্রকল্প চালু করলেও কতিপয় দূর্নীতি পরায়ন কর্মকর্তার কারণে সরকারের সহজ উদ্দেশ্য প্রতিফলিত হচ্ছে না । জুমের আগুনে বনজ সম্পদ তির অভিযোগঃ পার্বত্য তিন জেলায় অবাধে পতিত শত শত পাহাড়ে জুম চাষ করার প্রক্কালে সৃষ্ট (যা অশ্রেনীভুক্ত জমি হিসেবে পরিচিত) গাছপালাগুলা আগুনে পোড়ানোয় বছরে কমপে ২শ কোটি টাকার বনজদ্রব্য ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। জুমের পাহাড় থেকে ছিদকে আসা আগুনে বহু স্থানে সরকারী ব্যবস্থাপনায় সৃজিত মূল্যবান বনজ বাগানের গাছপালাও পুড়ে যায়। এছাড়াও জুম চাষের মৌসুমে বিশেষ করে এপ্রিল-মার্চ মাসে পাহাড়গুলোতে জুমের আগুন দেয়ার পর পরিবেশ দ্রুত দূষিত হয়ে পড়ছে এবং নানা রকম সংক্রামক রোগব্যাধি ছড়িয়ে পড়ে। তাছাড়া পাহাড়ের জীববৈচিত্র্য বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে বলে অনেকে অভিযোগ করেছেন।

Rangamati Pic

জুম চাষ নিয়ে তর্কবিতর্ক : জুম চাষের ফলে পরিবেশ বিপর্যয়, ভুমি য় ও বন্য প্রানী বিলুপ্তির ব্যাপারে ভিন্ন মতামত পাওয়া গেছে পরিশেবাদী ও সচেতন মহলের কাছ থেকে। এদের মধ্যে অনেকে বলেছেন, জুম চাষের ফলে পরিবেশ বিপন্ন হচ্ছে তা একটি অপ-প্রচার মাত্র। তারা জানান, পার্বত্য চট্টগ্রামে গত কয়েক দশকের মধ্যে ব্যাপক ভূমি য় ও বন বিনাশ ঘটেছে তা সত্য। কিন্তু এর জন্য বন বিভাগ ও বন শিল্প উন্নয়ন সংস্থাসহ সরকারী সরকারী সংস্থার কর্মকান্ড তথা রাষ্ট্রীয় নীতিমালাকে মূলত দায়ি করেছেন। আবার অনেকে জুম চাষ বন্ধ করে দেয়ার দাবিও জানিয়েছেন। তাদের মতে জুম চাষের ফলে পরিবেশ বিপন্ন হয়ে পড়ছে। জুম চাষীদের বিকল্প পথ হিসেবে বিভিন্ প্রকল্প হাতে নেয়া উচিত। এজন্য সরকার ও বে-সরকারী উন্নয়ন সংস্থাসমুহ উদ্যোগ নিতে পারে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম বন ও পরিবেশ সংরণ কমিটির যুগ্ন আহ্বায়ক জুমলিয়ান আমলাই জানান, পাহাড়ি এলাকায় জুম চাষের এই বিজ্ঞানসম্মত চাষাবাদ পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই প্রচলিত। তিনি নেপাল ও মিজোরামের পাহাড়ে জুম চাষ দেখেছেন বলে তিনি জানান।

চাকমা সার্কেলের চীফ ব্যারিস্টার রাজা দেবাশীষ রায় জানান জুম চাষীদের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো নয়। মূলতঃ জুম চাষীরা যেখানে জুম চাষ করে তা প্রত্যন্ত অঞ্চলে। সেখান থেকে জুমে উৎপাদিত ফসল বিক্রি করা অত্যন্ত কষ্টসাধ্যর ব্যাপার। তাছাড়া অধিকাংশ জুমিয়া পরিবার জুম থেকে উৎপাদিত যে ধান পায় তা ৪/৫ মাস পর্ষন্ত চললেও বাকী মাসগুলো কষ্টের মধ্যে চলতে হয়। তিনি এক প্রশ্নে জবাবে বলেন জুম চাষ খারাপ বা বালো তা নির্ভর করছে করছে জুমের জায়গার উপর। জুম চাষীরা সাধারণত রিজার্ভ ফরেস্টের যেখানে বেশী করে বাশঁ রয়েছে সেখানে বাশঁ কেটে পরিস্কার করে জুম চাষ করে থাকে। তাতে বরং জুম চাষের কারণে বিভিন্ন জীবজন্তু পশুপাখী আসছে। এতে বিভিন্ন পশুপাখীর বিষ্টের ফলে নতুন প্রজাতির গাছগাছালি সৃষ্টি হচ্ছে। ব্রিটিশ আমলের প্রবর্তিত টংগ্যার পদ্ধতিতে চাষ করলে(জুম চাষের সময় বা শেষে জুমে গাছ বাশঁ লাগানো) জুমে ক্ষতিকর হওয়ার কথা নয়। তাছাড়া জুম চাষের ফলে পাহাড়ের টপ সয়েল নষ্ট হয় না। কারণ জুম ধান বপণের সময় ছোট একটি গর্ত খুড়েঁ সেখানে বীজ বপণ করা হয়ে থাকে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় (সন্তু) লারমা জুম চাষের কারণে যে ভূমি ক্ষয়ক্ষতি হয় তাতে তিনি একমত নন উল্লেখ করে বলেছেন, শুষ্ক মৌসুমে জুম চাষের জন্য জঙ্গল কাটা ও গাছ পোড়ানো হয় এবং বর্ষা মৌসুমে জুমের ধানের চারার আকার বড় হয়। এতে পাহাড়ের জুমের  মাটি ক্ষয় হয়ে যাওয়ার কথা নয়।

–হিলবিডি২৪/সম্পাদনা/এনএ.

7

 

Print Friendly