পানছড়িতে ৭৫৩জন শিশু নিজেদের মাতৃভাষায় শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে

নূতন ধন চাকমা, পানছড়ি, হিলবিডিটোয়েন্টিফোর ডটকম

panchari-2,15.11.13_DMEABS

এসমিতা চাকমা, সরমিতা চাকমা, এনেসা চাকমা, নিকা চাকমা, ইনা চাকমা নিজেদের মাতৃ ভাষায় পড়ালেখা শিখতে পেরে খুবই খুশী। ইচ্ছেমত তারা নানান রকমের ছবি আকঁতে পারছে। খেলতে খেলেত তারা লেখাপড়া করেত পারছে। যেন তারা নিজেদের আপন ভূবণ খুজে পেয়েছে। তাইতো তারা মনের মত ছবি আকঁছে,খেলছে নিজেদের মত। আর কথাবার্তা বলছে নিজ নিজ মাতৃ ভাষায়।

পানছড়ি উপজেলা সদর থেকে বার কিলোমিটার দূরে দুর্গম করল্যা ছড়ির রত্মময় পাড়ার অংকুর প্রি-স্কুলের শিক্ষার্থীদের নিত্য দিনের চিত্র এটি। সেভ দি চিলড্রেন(ইউকে)-এর সহায়তায় খাগড়াছড়ি বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা জাবারাং কল্যান সমিতির উদ্যোগে এই স্কুলটি পরিচালিত হচ্ছে।

আজ শুক্রবার(১৫ নভেম্বর) এ প্রতিবেদক সরেজমিনে এ স্কুলের কার্যক্রম দেখতে গিয়ে স্কুলে ঢুকার সাথে সাথে শিশুরা সমস্বরে জু জু (চাকমা ভাষায় নমস্কার জানানো) দিয়ে অভ্যর্থনা জানাল। এ প্রতিবেদক যখন নিজের পরিচয় দেওয়ার পর শিশুদের পরিচয় জানতে চাইলেন তখন কোন ধরনের ভয় আর জড়তা ছাড়াই  তারা সবাই নিজেদের নাম একে একে বলে দিল। আর  শুধু নিজেদের নাম নয় তাদের মাবাবার নামও বলে ফেলল।

এই স্কুলের মাতৃ ভাষায় শিক্ষায় ও মাতৃ স্নেহে পাঠদান করাচ্ছেন শিক্ষিকা জ্যোন্সা চাকমা।  তিনি জানালেন, মাতৃ ভাষার মাধ্যমে শিশুদের শেখাতে আমার খুব ভালো লাগছে। আর শিশুরাও খুব আগ্রহ করে স্কুলে আসে। মায়ের বুকের দুধ খায় এমন শিশুও এ স্কুলে আসে জানান তিনি। তিনি আরও জানান মাতৃভাষায় তারা খুব সহজেই পড়া আয়ত্বে করতে পারছে। মাতৃভাষায় ছাড়া বাংলা ভাযায়ও পড়ানো হয়। যাতে প্রাইমারী স্কুলে গেলে বাংলা ভাষায় পড়তে কোন সমস্যায় পড়তে না হয় তাদের। তিনি জানান, এ স্কুল থেকে শিশুরা চারিত্রিক, মানসিক, বুদ্ধি বৃত্তি বিকাশ, সামাজিক ও আবেগিক বিকাশ সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া হয়ে থাকে।

স্কুলের শিক্ষার্থী সরমিতা চাকমা, এনেসা চাকমা জানায়, নিজেদের মাতৃভাষায় লেখা-পড়া করলে সহজেই পড়া মুখস্থ হয়। আমাদের দিদি মনি খুব আদর যত্ম করে মাতৃ স্নেহে পড়ান। লেখা পড়া ছাড়াও দিদি মনি আমাদেরকে নাচ, গান, ছড়া ও কবিতা পড়ান।

panchari-3,15.11.13_DMEABS

শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা জানান, এ স্কুলে পড়লে শিশুদের ভয়, জড়তা থাকে না। খেলার মাধ্যমে শিখতে পারে আর নাচও শিখে। শিকিক্ষরা মাতৃ স্নেহে পড়ান। তাই শিশুদের মাঝে শিক্ষার প্রতি আগ্রহ বেশী রয়েছে। এ কারণে বাসায় তারা দুষ্টামিও কম করে ।

এসমিতা চাকমার মা সোনা চাকমা, রেশমি চাকমার মা শোভা চাকমা বলেন, আমাদের সন্তানের মাতৃ ভাষায় লিখতে ও পড়তে পারে। তাই আমাদের খুব ভালো লাগছে। তাদের মতে সব সন্তানকে প্রথমে  মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষা দেওয়া দরকার। আমি নিজেও চাঙমা ভাষায় লিখতে, পড়তে জানি না। এখন আমাদের ছেলে-মেয়েরা চাকমা ভাষায় লিখতে ও পড়তে পারছে বলে  তাতে আমরা খুবই খুশি। শুনেছি আগামী ডিসেম্বরে স্কুলগুলোর কার্যক্রম বন্ধ হচ্ছে। এতে আমাদের ছেলে-মেয়েরা মাতৃভাষায় শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হবে। যাতে এ স্কুলগুলো লেখাপড়ার কার্যক্রম বন্ধ না হয় তার জন্য আমরা কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি ।

পানছড়ি উপজেলা জাবারাং কল্যান সমিতির প্রকল্প কর্মকর্তা বিদ্যাপূর্ণ চাকমা বলেন, ২০০৭ সাল থেকে আমাদের এ কার্যক্রম চলছে। এ প্রকল্পে ৩৪টি স্কুল রয়েছে। এদের মধ্যে চাকমা ভাষায় ২৫টি, টিপুরা ককবরক ভাষায় ৯টি রয়েছে। এদের মধ্যে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা কেন্দ্র ২০টি। এ স্কুলে ৫ বছর বয়সী শিশুদের প্রথমে মাতৃভাষা নির্দেশনা এবং পরে জাতীয় ভাষায় এক বছর পড়ানো হয় । সাথে সাথে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের যাওয়ার জন্য প্রস্তুত করা হয়। ২০টি স্কুলে শিশু শিক্ষার্থী রয়েছে। কমিউনিটি লার্নিং সার্কেল (সিএলসি) স্কুল ১১টি। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১ম ও ২য় শ্রেণী পিছিয়ে পড়া শিশুদের খেলায় খেলায় শিক্ষা বাংলা, ইংরেজি ও গণিত বিষয়ের উপর শিক্ষা দেওয়া হয়। বর্তমানে ২শ ২৪ জন ছাত্র-ছাত্রী রয়েছে। তিনি আরও জানান, এখানে গ্রেড-২ ক্লাশ সেন্টার স্কুল সংখ্যা-৩টি রয়েছে। মাতৃভাষা ভিত্তিক প্রাথমিক শিক্ষা প্রথমে মাতৃভাষায় নিদের্শনা দেওয়া হয় এবং পরে জাতীয় ভাষায় শিক্ষা দেওয়া হয়। এখানে মোট ৩৭ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। এছাড়া স্কুলের শিক্ষিকরা গ্রামের বাল্যবিবাহ রোধসহ বিভিন্ন আত্ম-সামাজিক উন্নয়ন মূলক কাজে সহায়তা করছেন।

এদিকে ইউএনডিপি-সিএইচটিডিএফ এর সহায়তায়  খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের উদ্যোগে পানছড়ি উপজেলার ২৬টি মাতৃভাষা ভিত্তিক স্কুল রয়েছে। এ প্রোগ্রামের ট্রেনিং অফিসার নিখিল চৌধুরী বলেন, শিশুরা মাতৃ ভাষায় খুব সহজেই পড়া আয়ত্বে নিতে পারে এবং মাতৃভাষায় শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করার মাধ্যমে শিশুরা তাদের পাঠকে অধিকতর স্থায়ী করতে পারে।

জাবারাং কল্যান সমিতির শিক্ষা প্রোগ্রামের প্রকল্প সমন্বয়ক বিনোদন ত্রিপুরা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে অবহেলিত বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষার সুযোগ করে দিতে পেরে এবং এ প্রোগ্রামে কাজ করার সুযোগ পাওয়ায় আমি খুবই খুশি। এ প্রকল্পের মাধ্যমে শিশুরা শিশু অধিকার সম্পর্কে পরিপূর্ণ ধারনা পাচ্ছে। তাদেরকে প্রথমে মাতৃ ভাষায় শিক্ষা দেওয়া আমাদের মৌলিক ও সামাজিক দায়িত্ব। এ প্রোগ্রামের মাধ্যমে আমরা শিশুরা শিশুর চারিত্রিক, মানসিক, বুদ্ধি বৃত্তিয় বিকাশ, সামাজিক ও আবেগিক বিকাশ সম্পর্কে শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে । তিনি আরও বলেন, আগামী ডিসেম্বরে আমাদের প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। এ প্রকল্পের আর্থিক সহায়তা না পেলে স্কুল চালানো সম্ভব নয়। তিনি পাহাড়ের সকল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যেন মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের সুযোগ করে দেওয়া হয় তার জন্য সরকারে প্রতি অনুরোধ জানান।

–হিলবিডি২৪/সম্পাদনা/সিআর.

Print Friendly