দীঘিনালায় প্রকৃতি ফিরে পাচ্ছে সবুজের সমারোহ

জাহাঙ্গীর আলম রাজু, দীঘিনালা,হিলবিডিটোয়েন্টিফোর ডটকম

dighinala-pic(2)-23-11-2013_DMEABS

খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার ন্যাড়া পাহাড়ে গড়ে উঠেছে অসংখ্য মিশ্রফল ও বাণিজ্যিক কাঠের বাগান। এসব বাগানকে ঘিরে ভাগ্য বদলের স্বপ্ন দেখছেন অসংখ্য মানুষ। এক সময় যেসব পাহাড়ে শুধুমাত্র জুম চাষ করা হতো। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে সেই সব পাহাড়ে বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোন থেকে গড়ে তোলা হচ্ছে মিশ্র ফল ও কাঠের বাগান। ইতোমধ্যে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রায় দেড় হাজারেরও অধিক মিশ্রফল ও বাণিজ্যিক কাঠের বাগান গড়ে তোলা হয়েছে। এসব বাগান সৃজনের ফলে প্রাকৃতিক পরিবেশ ফিরে পাচ্ছে হারানো সবুজের সমারোহ। পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী পরিবেশের বিরুপ প্রভাব মোকাবেলায় রাখছে সহায়ক ভূমিকা। বন সম্পদ উজাড় এবং জুমচাষের ফলে বৃক্ষহীন পাহাড়ের চুড়ায় এখন শোভা পাচ্ছে নানা প্রকার মৌসুমী ফল ও বাণিজ্যিক কাঠের বাগান।

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকে প্রতি বছর উপজেলা সদর কিংবা দুর্গম পাহাড়ী এলাকায় মিশ্র ফল ও বাণিজ্যিক কাঠের বাগান গড়ে তুলতে এযেন প্রতিযোগীতায় নেমেছেন এই অঞ্চলের বৃক্ষপ্রেমী মানুষ।

কৃষি বিভাগের দেয়া তথ্যমতে মিশ্র ফল ও বাণিজ্যিক কাঠের বাগানের পাশাপাশি অনেকে বাসা বাড়ির আঙ্গিনায়ও গড়ে তুলেছেন ছোট বড় অসংখ্য ফলের বাগান। এসব বাগানের মাধ্যমে ইতোমধ্যে অনেকেই হয়েছেন স্বাবলম্বী। জুম চাষ ও বন সম্পদ উজাড়ের ফলে হারিয়ে যাওয়া সবুজ পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে পতিত পাহাড়ে গড়ে উঠা এসব বাগান। একদিকে পাহাড় জুড়ে সবুজের সমারোহ সৃষ্টি অন্যদিকে বাগানে উৎপাদিত কৃষিপণ্যের বিক্রিত অর্থে বাগান মালিকদের ভাগ্য বদলের স্বপ্ন বাস্তবায়ন। সব মিলে বৃক্ষ প্রেমীদের এই উদ্যোগ এই এলাকার কৃষি এবং কৃষকের জন্য একটি সফল পদযাত্রা বলে মনে করছেন স্থানীয় কৃষিবিদ ও পরিবেশবাদীরা। এই এলাকার জুম চাষীদেরকে সরকারী অর্থায়নে এই উদ্যোগের সাথে সম্পৃক্ত করা হলে হারিয়ে যাওয়া সবুজ পরিবেশ সহজ উপায়ে ফিরিয়ে আনা সম্ভব বলেও মনে করছেন তারা।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, উপজেলার বিভিন্ন দুর্গম পাহাড়ী এলাকায় গড়ে উঠেছে আম, কাঠাল, লিচু, আনারস, কলা, কমলা, লেবু , জাম্বুরা, লটকন ও মালটাসহ অসংখ্য মিশ্র ফলের বাগান। পাশাপাশি গড়ে উঠেছে রাবার, সেগুন ও গামারিসহ অসংখ্য বাণিজ্যিক কাঠের বাগান।

উপজেলার দুর্গম ১০ নম্বর এলাকার আম বাগানের মালিক যত্ন মানিক চাকমা জানান, এ অঞ্চলের পাহাড়ের মাটি খুবই উর্বর। যে কোনো ফলের বাগান কিংবা কাঠের বাগান সহজভাবেই ফলে থাকে। তাই এলাকার সচেতন মানুষ পতিত পাহাড়ে মিশ্র ফলের বাগান ও বাণিজ্যিক কাঠের বাগান গড়ে তুলতে মনোযোগী হচ্ছেন। তিনি আরও জানান, নিজেও পতিত এই পাহাড়ের পাঁচ একর এলাকা জুড়ে বিভিন্ন উন্নত প্রজাতির আম বাগান করেছেন। গত বছর তার আম বাগানের কিছু কিছু গাছে মুকুল এলেও এখনো উৎপাদন শুরু হয়নি।

উপজেলার ভগিরথ পাড়ার সোহেল চাকমা জানান, তিনি তিন একর পাহাড়ে উন্নত প্রজাতির লিচু ও আম বাগান গড়ে তুলেছেন। গত বছর থেকে উৎপাদন শুরু হয়েছে। প্রায় লক্ষাধিক টাকার লিচু ও আম বিক্রি করেছেন।

বাবুছড়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান পরিতোষ চাকমা জানান, এই এলাকার অসংখ্য মানুষ মিশ্র ফলের বাগান ও বাণিজ্যিক কাঠের বাগান গড়ে তুলেছেন। পাহাড়ের উর্বর মাটিকে অবলম্বন করে ভাগ্য বদলের স্বপ্ন দেখছেন তারা। বাবুছড়া ইউনিয়নে তিনশ একর পাহাড়জুড়ে রয়েছে কমলা বাগান। তিনি নিজেও একজন কমলা চাষী। তিনি আরও জানান, বর্তমানে জেলাবাসীর কমলার চাহিদা অনেকটাই পূরন করছে দুর্গম বাবুছড়ায় উৎপাদিত কমলায়। পাশাপাশি লটকনের বাগানও গড়ে তোলা হচ্ছে। সঠিক পরিকল্পনা ও উদ্যোগী হলে এই এলাকার পাহাড়ের উর্বর মাটি যে কারোরই ভাগ্য বদলে দিতে পারে বলে জানান তিনি।

উপজেলার বৈরফা নোয়াপাড়া গ্রামের বৃক্ষপ্রেমী অবসর প্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক দয়া রঞ্জন চাকমা জানান, তাদের এই এলাকার পাহাড়ের মাটি সোনার চেয়েও খাঁটি। সঠিক পরিকল্পনা ও পরিশ্রমী মনোভাব নিয়ে এগিয়ে এলে পাহাড়ের মাটিতে সোনা ফলানো সম্ভব। যারা ফলদ ও বনজ বাগান সৃজনের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে এসেছেন তারা সফল হয়েছেন। পতিত পাহাড়ে ফলের বাগান করে যারা সফল হয়েছেন তিনিও তাদেরই একজন।

রাষ্ট্রপতির পদকপ্রাপ্ত মিশ্র ফল বাগানের অবস্থানও দীঘিনালায়। উপজেলার মধ্য বোয়ালখালী এলাকায় প্রায় ২৫ একর পাহাড়জুড়ে গড়ে তোলা হয়েছে মিশ্র ফলের বাগান। বাগান মালিক তুষার কান্তি বসু জানান, এই বাগান সৃজনের মাধ্যমে তিনি স্বাবলম্বী হয়েছেন। তার এই বাগানের সব ধরনের ফলের গাছ রয়েছে। তাই সারা বছরই কোনো না কোনো ফল পাওয়া যায় তার এই বাগানে। সম্প্রতি পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের সচিব নব বিক্রম কিশোর ত্রিপুরা দুর্গম বাবুছড়া ইউনিয়নের কমলা বাগান পরিদর্শন করেন।

পরিদর্শনকালে তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে সংঘাতমুক্ত রাজনৈতিক পরিবেশ এবং শান্তি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস চিরস্থায়ী হলে পাহাড়ের মাটিই এই অঞ্চলের মানুষের ভাগ্য বদলে দিতে পারে। কারন পাহাড়ে উৎপাদিত ফল ও কাঠের রয়েছে দেশব্যাপী ব্যাপক চাহিদা। তবে চাহিদা মোতাবেক উৎপাদন না হওয়ায় এখনো চাহিদা পূরন করতে বিভিন্ন দেশ থেকে ফল ও কাঠ আমদানি করতে হচ্ছে। তাই আমদানি মুখী মনোভাব পরিহার করে রফতানি মুখী মনোভাব সৃষ্টির লক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রামে ব্যাপকহারে মিশ্র ফল ও বাণিজ্যিক কাঠের বাগান গড়ে তোলার জন্য তিনি পাহাড়ের মানুষের প্রতি অহ্বান জানান।

খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা জানান, পাহাড়ের চুড়ায় গড়ে উঠা মিশ্র ফলের বাগান এবং বাণিজ্যিক কাঠের বাগান এই অঞ্চলের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। ইচ্ছে এবং আগ্রহ থাকলে পাহাড়ের মাটিই এ অঞ্চলের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করে দিতে পারে বলে জানান তিনি।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোঃ সালাউদ্দীন জানান, এই এলাকায় মিশ্র ফলের বাগান ও বাণিজ্যিক কাঠের বাগান সৃজনে মানুষের মাধ্যে অর্থনৈতিক সফলতা অর্জনের ক্ষেত্রে যে উৎসাহ কিংবা আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে তা সফলভাবে সম্প্রসারিত হলে নিজেদের স্বার্থ সংরক্ষনের পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতেও সহায়ক ভূমিকা রাখবে। এসব বাগান সৃজনের মাধ্যমে এ অঞ্চলের মানুষের জীবন এবং জীবিকার প্রয়োজনে অর্থনৈতিক চাহিদা পূরণের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে বলে জানান তিনি।

–হিলবিডি২৪/সম্পাদনা/সিআর.

Print Friendly