জনমতের বিপরীতে সরকার প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং মেডিকেল কলেজ স্থাপন করলে পার্বত্যাঞ্চলে আগুন জ্বলবে

স্টাফ রিপোর্টার, হিলবিডিটেয়েন্টিফোর ডটকম

02

 

পার্বত্য চুক্তি যথাযথ বাস্তবায়িত না হওয়া পর্ষন্ত রাঙামাটিতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, এবং মেডিকেল কলেজ স্থাপন স্থগিতের দাবিতে দাবীতে বৃহস্পতিবার বিক্ষোভ-সমাবেশ ও প্রধানমন্ত্রীর বরাবরে স্মারকলিপি প্রেরণ করা হয়েছে।

সমাবেশে বক্তারা সম্পাদিত পার্বত্য চুক্তির ১৭ বছরেও যথাযথ বাস্তবায়ন করতে পারেনি অভিযোগ করে বলেছেন, সরকার পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন না করে একের পর এক চুক্তি বিরোধী কার্যক্রম চালিয়ে যাচেছ। পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সাথে কোন রুপ মতামত না নিয়ে এ অঞ্চলে উন্নয়ন নামে ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে। আদিবাসী পাহাড়ীদের নিজ ভিটে মাটি থেকে উচ্ছেদ করার চক্রান্ত চালাচ্ছে। বক্তারা পার্বত্য চুক্তির পরিপন্থী পার্বত্য জেলা পরিষদ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের সংশোধিত আইন বাতিল এবং স্থায়ী বাসিন্দাদের নিয়ে ভোটার তালিকা প্রনয়ন করে অবিলম্বে তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের নির্বাচনের দাবি জানান।

রাঙামাটি সদর উপজেলাবাসী ব্যানারে জেলা প্রশাসন কার্যালয় চত্বরে প্রতিবাদ সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক কমিটির সভাপতি গৌতম দেওয়ান। এতে অন্যান্যর মধ্যে বক্তব্যে রাখেন শিক্ষাবিদ প্রফেসর মংসানু চৌধুরী, এম এন লারমা মোমোরিয়্যাল ফাউন্ডেশনের আহ্বায়ক বিজয় কেতন চাকমা, সদর উপজেলা পরিষদের মহিলা ভাইস-চেয়ারম্যান রীতা চাকমা, বালুখালী ইউপি চেয়ারম্যান বিজয়গিরি চাকমা, ব্লাষ্টের জেলা সমন্বয়ক এ্যাডভেকেট জুয়েল দেওয়ান প্রমুখ।

01

সমাবেশে শেষে নেতৃবৃন্দ ১৫ দফা দাবি সম্বলিত একটি স্মারকলিপি অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট-এর মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর বরাবরে প্রেরণ করেন। স্মারকলিপিতে রাঙামাটি সদর উপজেলার ১শ ৫ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি, গণপ্রতিনিধি, হেডম্যান-কার্বারী, উন্নয়ন কর্মী, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, নারী ও যুব অধিকার কর্মী, বিভিন্ন পেশাজীবী নেতৃবৃন্দ স্বাক্ষর প্রদান করেন। এর আগে বিক্ষোভ-মিছিলটি শহরের জেলা শিল্পকলা একাডেমী চত্বর থেকে শুরু হয়ে জেলা প্রশাসন কার্যালয় চত্বরে গিয়ে শেষ হয়।

প্রফেসার মংনাসুচৌধুরী বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে মাত্র ৩ শতাংশ জায়গা চাষাবাদের যোগ্য। এখানে আবাদি জমির অভাব রয়েছে। অধিকন্তু ব্রিটিশ আমলে ১৩ লক্ষ একর রক্ষিত বন ঘোষণা হয়েছে। ষাট দশকে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের ফলে ৫৪ হাজার একর ধান্য জমি হ্রদের পানিতে তলিয়ে যায়। জনগণের মতামত ছাড়াই ২ লক্ষ ১৮ হাজার একর ভূমি সংরক্ষিণ বন ঘোষণা স্থানীয় জনগণকে উচ্ছেদের মুখে ঠেলে দেয়া হয়েছে। সরকারী পৃষ্টপোষকতায় ৪ লক্ষাধিক বহিরাগত বাঙালি পার্বত্য চট্টগ্রামে বসতি প্রদান করা হয়। সেনানিবাস ও ক্যাম্প সম্প্রসারণের নামে হাজার হাজার একর জমি অধিগ্রহণ করা হচ্ছে। তাহলে এখানকার জুম্ম-বাঙালি স্থায়ী অধিবাসীদের জায়গা-জমি থাকবে কোথায়? তাই পার্বত্যাবাসীর এ সমস্যাকে অনুধাবন করে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে কার্যক্রম হাতে নিতে তিনি সরকারকে আহ্বান জানান।

তিনি আরও বলেন, পার্বত্যবাসীর মতামতকে উপেক্ষা করে সংঘাতের পথে কোন সমাধান হতে পারে না। সংঘাত ও অশান্তির পথ পরিহার করে আলোচনার মাধ্যমে ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং মেডিকেল কলেজ স্থাপন সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানের জন্য তিনি সরকারকে আহ্বান জানান।

সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে গৌতম দেওয়ান বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজ স্থাপনের উদ্যোগ স্থগিত করার দাবি করে সরকারের প্রতি হুশিয়াশি উচ্চারণ করে বলেন, জনমতের বিপরীতে সরকার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং মেডিকেল কলেজ স্থাপনের উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হলে পার্বত্য চট্টগ্রামে আগুন জ্বলবে। আর তার জন্য সরকারই দায়ি থাকবে।

তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন না করে এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সাথে আলোচনা ও পরামর্শ না করে সরকার জনমতের বিপরীতে যে অন্তর্বর্তীকালীন পার্বত্য জেলা পরিষদের আকার ৫ সদস্য থেকে ১১ সদস্যে বাড়ানোর লক্ষ্যে পরিষদের আইন সংশোধন এবং রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং মেডিকেল কলেজ স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। ৫ সদস্য-বিশিষ্ট অন্তর্বর্তী পার্বত্য জেলা পরিষদ দিয়ে পরিষদের কার্যাবলী পরিচালনা করা সম্ভব নয় বিধায় সরকার অন্তর্বর্তী পরিষদের আকার বাড়ানোর অগণতান্ত্রিক উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু সরকার এটা কেন বুঝে না যে, অন্তর্বর্তী পরিষদের সদস্য-সংখ্যা যতই বাড়ানো হোক না কেন তা জনপ্রতিনিধিত্বশীল ও জবাবদিহিমূলক পরিষদ গড়ে উঠতে পারে না। এযাবৎ অন্তর্বর্তী পরিষদে মনোনীত চেয়ারম্যান-সদস্যদের জনবিরোধী কার্যμম দেখে তা ইতোমধ্যেই তা স্পষ্ট হয়েছে। আর অন্তর্বর্তী পরিষদের  সদস্যসংখ্যা ৫ থেকে ১১ জনে বাড়ানোর ফলে কিছু স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বা কায়েমী স্বার্থান্বেষীদের সংখ্যা বাড়বে বৈ এখানকার জনগণের কোন উপকার হবে না।

তিনি অন্তর্বর্তী পরিষদের সদস্যসংখ্যা বাড়ানোর লক্ষ্যে তিন পার্বত্য  জেলা পরিষদের আইন সংশোধনের উদ্যোগ বাতিল করে তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ৩৪-সদস্য বিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ পরিষদ গঠনের দাবি জানান।

 তিনি আরও বলেন, রাঙামাটিতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং মেডিকেল কলেজ স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং মেডিকেল কলেজ স্থাপনের ক্ষেত্রে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিশেষ প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা হয়নি। এমনকি ছাত্রছাত্রী ভর্তি ও শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগেও পার্বত্য চট্টগ্রামের স্বাতন্ত্র্যতাকে বিবেচনায় নেয়া হয়নি। অধিকন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং মেডিকেল কলেজ স্থাপনের মতো জায়গা-জমির সংকট রয়েছে।

জুম্ম জনগণ তাদের জমি হারাতে হারাতে দেয়ালে তাদের পিঠ ঠেকে গেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রথমে ঝগড়াবিল মৌজায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের কথা ছিল, যেখানকার অধিবাসীরা কাপ্তাই বাঁধ, পর্যটন ও বিজিবি হেডকোয়ার্টার দ্বারা পর পর উচ্ছেদ হয়েছে। তারা যাবে কোথায়? এরপর বালুখালীতে কৃষি খামার ভূমিতে স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এই কৃষি খামারে বড়জোর ৬০ থেকে ৭০ একর জায়গা রয়েছে। অথচ একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে কমপক্ষে ৬শ থেকে ৭শএকর জায়গা লাগে। বাকী জায়গাগুলো কোত্থেকে আসবে? নি:সন্দেহে আশেপাশের ত্রিপুরা-তংচংগ্যা অধ্যুষিত গ্রামবাসীদের কাছ থেকে তাদের বাস্তুভিটা ও বাগান-বাগিচার জায়গা-জমিগুলো নিতে হবে। তাহলে এসব গ্রামবাসীরা যাবে কোথায়?
–হিলবিডি২৪/সম্পাদনা/সিআর.

Print Friendly