খাগড়াছড়ি আসনে নির্বাচনী ফলাফলের চার নিয়ামক

বিশেষ প্রতিনিধি, খাগড়াছড়ি, হিলবিডিটোয়েন্টিফোর ডটকম

10th MP Electionhillbd24.com

খাগড়াছড়ি আসনে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি’র গুচ্ছগ্রামভিত্তিক ভোট ব্যাংক, পাহাড়ী অধ্যুষিত এলাকায় ইউপিডিএফ’র প্রভাব; আওয়ামীলীগ প্রার্থীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে।

অপরদিকে পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে রদ-বদল এবং স্বতন্ত্রপ্রার্থী মৃণাল ত্রিপুরা’র স্ত্রীসহ ৬ নারীকে আটকে রাখার ঘটনা, আওয়ামীলীগকে ভোটের মাঠে বেশ এগিয়ে রেখেছে। তবে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী বিএনপি’র নেতাকর্মীরা ভোট বর্জনে অনড় থাকলে বেশ বেকায়দায় পড়তে হতে পারে জাতীয় পার্টি প্রার্থীকে।
এরই মধ্যে ৩ লাখ ৮১ হাজার ৯’শ ১৬ জন নারী-পুরুষের ভোট গ্রহণের লক্ষ্যে ভোটের সকল সরঞ্জাম পৌঁছে গেছে কেন্দ্রে কেন্দ্রে। নিরাপত্তায় স্ট্রাইকিং ফোর্স ছাড়াও পুরো জেলার কেন্দ্রে কেন্দ্রে প্রায় ৩ হাজার নিরাপত্তাকর্মী সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করবেন।

১’শ ৮১ কেন্দ্রে ১ জন করে প্রিসাইডিং অফিসার, ৮’শ ২৫টি বুথে একজন করে সহকারী প্রিসাইডিং এবং ২ জন করে পোলিং অফিসার ১ লক্ষ ৯৭ হাজার ৮’শ ৬৫ জন পুরুষ এবং ১ লক্ষ ৮৪ হাজার ৫১ জন নারী ভোটারের ভোট গ্রহণ করবেন।

জেলায় কমিউনিটি ভিত্তিক ভোটের বেসরকারী এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, এককভাবে চাকমা সম্প্রদায়ের ভোটের সংখ্যা ১ লাখ ৩১ হাজার, বাঙ্গালী মুসলিম ভোটোরের সংখ্যা ১ লাখ ১৮ হাজার, মারমা সম্প্রদায়ের ভোটারের সংখ্যা ৪৫ হাজার, ত্রিপুরা ভোটারের সংখ্যা ৪৮ হাজার এবং হিন্দু ও বড়–য়া বৌদ্ধ ভোটোরের সংখ্যা ৩৮ হাজার।

এই পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে সব সম্প্রদায়ের মধ্যেই পুরনো রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামীলীগের কম-বেশী জনসমর্থন রয়েছে।

অপরদিকে বিগত দুটি নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের হিসাব অনুযায়ী নতুন রাজনৈতিক দল হলেও ‘ইউপিডিএফ’ বেশ ভালোই অবস্থান সৃষ্টি করেছে। অষ্টম ও নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলটি’র ভোটের অংক বেড়েছে রীতিমতো জ্যামিতিক হারে।

তবে এবারের নির্বাচনে জনসংহতি সমিতি (এম এন লারমা) অংশের প্রার্থীতা দলটিকে কিছুটা বেকায়দায় ফেলে দিয়েছে। তার ওপর গত শুক্রবার বিকেলে ‘এম এন লারমা’ অংশের বই প্রতীকের প্রার্থী মৃণাল ত্রিপুরা’র স্ত্রী পরিণীতা চাকমাকে আটকে রাখার ঘটনায়, আঞ্চলিক দল দুটি’র নির্বাচনী সর্ম্পকে বিরুপ প্রভাবের আশংকা দেখা দিয়েছে।

তাছাড়া মৃণাল ত্রিপুরা, ব্যক্তি হিসেবে ত্রিপুরাদের মধ্যে প্রভাবশালী হওয়ায় তিনি আওয়ামীলীগ প্রার্থীর ভোট ব্যাংকেও মৃদু হানা দিতে পারেন।

নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর পর আইনী জটিলতা এড়াতে আওয়ামীলীগ প্রার্থী পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ছেড়ে দিয়ে, মারমা উন্নয়ন সংসদের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও পরিষদ সদস্য চাইথোঅং মারমাকে চেয়ারম্যান হবার পথ খালি করে দেন।

তাতে মারমা সম্প্রদায়ের একটি বড়ো অংশের ব্লাইন্ড সমর্থন, কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা’র দিকে ঝুঁকে পড়ে রাতারাতি। কিন্তু নির্বাচনী প্রচারণার মাঠে খাগড়াছড়ির বর্তমান সংসদ সদস্য যতীন্দ্র লাল ত্রিপুরাসহ জেলা আওয়ামীলীগের অনেক শীর্ষ নেতার অনুপস্থিতি দলটির তৃণমূল নেতাকর্মীদের মাঝে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

বিএনপি সমর্থিত মারমা সংগঠন ‘মারমা সংগঠন ঐক্য পরিষদ’-ভূক্তরা ভোট বর্জন না করলে; এসব ভোট ইউপিডিএফ প্রার্থী’র দিকে যোগ হবার সম্ভাবনা রয়েছে।
জেলায় সাংগঠনিকভাবে সবচেয়ে পিছিয়ে আছে, এরশাদ নিয়ন্ত্রিত ‘জাতীয় পার্টি’। দলটির মনোনীত প্রার্থী, দলটির বড়ো নেতা হলেও তিনি খাগড়াছড়িতে স্বল্প পরিচিত। স্থায়ীভাবে চট্টগ্রামের বাসিন্দা হবার কারণে তাঁর সাথে জেলার সর্বস্তরের মানুষের যোগাযোগও সীমিত।

কিন্তু তফসিল ঘোষণার পর রাতদিন প্রচার-প্রচারণা এবং অধিকতর গণসংযোগের ফলে বাঙ্গালীদের বড় একটি অংশ তাঁর দিকে ঝুঁকেছে। পহেলা জানুয়ারী জাতীয় পার্টি’র ২৮তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষ্যে বিশালাকার এক ‘শো-ডাউন’ করে বেশ চমকে দিয়েছেন, খাগড়াছড়িবাসীকে।

তাছাড়া পাহাড়ী-বাঙ্গালী সম্প্রদায়ের প্রবণ জনপদ হিসেবে, একমাত্র বাঙ্গালী প্রার্থী হবার সুবাদে তিনি অনেক সাধারণ বাঙ্গালী ভোটারের সমবেদনা পাওয়ার নিরন্তর চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন।

নির্বাচনী এতোসব ঢামাডোলের মধ্যেও জেলার ৮১টি গুচ্ছগ্রামে বিএনপি-জামাত সমর্থকরা সংগঠিত কৌশলে ভোটারদের ভোট কেন্দ্রে না গিয়ে নির্বাচন বর্জনে উদ্বুদ্ধ করে চলেছেন।

বিএনপি’র ভোটব্যাংক হিসেবে পরিচিত এসব গুচ্ছগ্রামে গত বুধবার থেকে সাবেক এমপি ও জেলা বিএনপি’র সভাপতি ওয়াদুদ ভূইয়ার একটি প্রচারপত্র বিলি হবার পর ভোটারদের মধ্যে নির্বাচন বিরোধী জনমত প্রবল হয়ে উঠেছে।

জেলা বিএনপি’র সহ-সভাপতি মনীন্দ্র লাল ত্রিপুরা জানিয়েছেন, আমরা ১৮দলীয় জোটনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অনুসারীরা সরকারের একতরফা এই নির্বাচন বর্জনে পদ্ধপরিকর।

এবার নির্বাচনে খাগড়াছড়ি আসনে আওয়ামীলীলীগের কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা (নৌকা), জাতীয় পাটি (এরশাদ)-র সোলায়মান আলম শেঠ (লাঙ্গল), ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট’র( ইউপিডিএফ) প্রসিত বিকাশ খীসা (হাতি), পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি (এমএন লারমা) মৃণাল কান্তি ত্রিপুরা (বই) ও ইউপিডিএফ’র উজ্জল স্মৃতি চাকমা(টেবিল) প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্ধীতা করছেন।

নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত পার্বত্য খাগড়ছড়িঃ
জেলা নির্বাচন অফিসার মোঃ নুরুল আলম জানিয়েছে, জেলার লক্ষ্মীছড়ি উপজেলা বর্মাছড়ি ইউনিয়নের শুকনাছড়ি এবং দীঘিনালা উপজেলার বাবুছড়া ইউনিয়নের নাড়াইছড়ি ভোটকেন্দ্র অত্যধিক দুর্গম হবার কারণে ভোটের সরঞ্জাম ও নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গকে আনা-নেয়ার জন্য হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হচ্ছে।

তিনি জানান, নির্বাচন পর্যবেক্ষণে ‘কোস্ট ট্রাষ্ট’ নামের একটিমাত্র বেসরকারী প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশনের অনুমোদন পেয়েছে।

‘কোস্ট ট্রাষ্ট’র পর্যবেক্ষক দলের টীম লিডার তপন বিকাশ ত্রিপুরা জানান, তাঁদের মোট ১’শ ১৪ জন কর্মী জেলার লক্ষ্মীছড়ি ছাড়া বাকী ৭ উপজেলায় পর্যবেক্ষণে নিয়োজিত থাকবেন।

খাগড়াছড়ির পুলিশ সুপার শেখ মোঃ মিজানুর রহমান জানান, জেলার সবক’টি ভোট কেন্দ্রের নিশ্চিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। শনিবার(৪ জানুয়ারী) থেকে কেন্দ্রে কেন্দ্রে ভোটের সরঞ্জাম সুরক্ষায় ১’শ ৮১টি কেন্দ্রে প্রায় ৩ হাজার নিরাপত্তাকর্মী নিয়োজিত রাখা হয়েছে। তাছাড়া পুলিশ-বিজিবি-সেনাবাহিনী ও র‌্যাবের অংশগ্রহণে গঠিত শক্তিশালী ‘স্ট্রাইকিং ফোর্স’ জেলাশহর থেকে প্রত্যন্ত এলাকা পর্যন্ত টহলদারিতে রয়েছেন।

খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক ও রির্টানিং অফিসার মোঃ মাসুদ করিম জানান, অবাধ ও সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত এবং নির্বাচনকে নির্বিঘœ করতে পৃথক দুটি সেল গঠন করা হয়েছে। পুলিশের গোয়েন্দা শাখার তথ্যমতে ১’শ ৮১ টি কেন্দ্রের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ ১’শ ৫৯টি কেন্দ্রে বাড়তি নিরাপত্তা নেয়ো হচ্ছে। দীঘিনালার দূর্গম ১টি এবং লক্ষ্মীছড়ি উপজেলার ১টি কেন্দ্রে ভোটার সামগ্রী পরিবহনে হেলিকপ্টারের সাহায্য নেয়া হয়েছে। কোন প্রার্থীর পক্ষ থেকে এখনো পর্যন্ত আচরণ বিধি লংঘনের কোন অভিযোগ পাওয়া যায়নি।
–হিলবিডি২৪/সম্পাদনা/সিআর.

Print Friendly