খাগড়াছড়িরত ইউপিডিএফের সমর্থিত  আট সংগঠনের জাতীয় কনভেশন অনুষ্ঠিতঃ ১১ দফা দাবি ও রাজনৈতিক প্রস্তাবনা পাস

ডেস্ক রিপোর্ট, হিলবিডিটোয়েন্টিফোর ডটকম

8 orgnization convention1

খাগড়াছড়িতে বৃহস্পতিবার  ইউনাইটেড পিপল্স ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট(ইউপিডিএফ)-এর সমর্থিত  গণতান্ত্রিক যুব ফোরামসহ আট সংগঠনের জাতীয় কনভেশন অনুষ্ঠিত হয়েছে। কনভেশনে দীঘিনালার বাবুছড়ায় বিজিবি ব্যাটেলিয়ন সদর দপ্তর নির্মাণের সিদ্ধান্ত বাতিলপূর্বক অবিলম্বে উচ্ছেদকৃত পরিবারদের স্ব স্ব বাস্তুভিটা ও জায়গা-জমিতে প্রত্যাবর্তনের ব্যবস্থাসহ বন্ধ হওয়া প্রাইমারি স্কুলটি চালু করাসহ ১১ দফা দাবি উপাস্থপন করা হয়।

৮ সংগঠনের আহ্বায়ক কমিটির  সদস্য সচিব অংগ্য মারমার স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে বলা হয়, খাগড়াছড়ি সদরের নারাঙখিয়াস্থ সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত কনভেনশনে ৮ সংগঠনের সমন্বয়ক ও গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের কেন্দ্রীয় সভাপতি মাইকেল চাকমার সভাপতিত্বে অন্যান্যর মধ্যে বক্তব্য রাখেন ইউনাইটেড পিপল্স ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট(ইউপিডিএফ)-এর কেন্দ্রীয় নেতা সচিব চাকমা, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি থুইক্যচিং মারমা, হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সভাপতি নিরূপা চাকমা, সাজেক ভূমি রক্ষা কমিটির সভাপতি জ্ঞানেন্দু বিকাশ চাকমা, পার্বত্য চট্টগ্রাম নারী সংঘের সভাপতি সোনালী  চাকমা,  সাজেক নারী সমাজের সাধারণ সম্পাদক জ্যোস্না রাণী চাকমা, ঘিলাছড়ি নারী নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটির আহ্বায়ক শান্তি প্রভা চাকমা, প্রতিরোধ সাংস্কৃতিক স্কোয়ার্ডের সদস্য জ্ঞানকীর্তি চাকমা ও নির্বাচিত জুম্ম জনপ্রতিনিধি সংসদের সভাপতি ও পানছড়ি উপজেলা চেয়ারম্যান সর্বোত্তম চাকমা। কনভেশন সঞ্চালনা করেন গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের সাধারণ সম্পাদক অংগ্য মারমা।

এছাড়া কনভেনশনে ইউপিডিএফ-এর খাগড়াছড়ি জেলা সমন্বয়ক প্রদীপন খীসা, হেডম্যান এসোসিয়েশনের খাগড়াছড়ি জেলার সহ সভাপতি ক্ষেত্র মোহন রোয়াজা, বিশিষ্ট মুরুব্বী কিরণ মারমা, সমাজ কর্মী অনুপম চাকমা, নিপুল কান্তি চাকমা প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। কনভেনশনে তিন পার্বত্য জেলা, ঢাকা-চট্টগ্রাম থেকে তিন শতাধিক নেতা-কর্মী অংশগ্রহণ করেন। কনভেনশনের অনুষ্ঠান শুরুতে অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে শহীদদের স্মরণে দুই মিনিট নিরবতা পালন করা হয়। ৮ সংগঠনগুলো হল পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ, হিল উইমেন্স ফেডারেশন, পার্বত্য চট্টগ্রাম নারী সংঘ, সাজেক নারী সমাজ, সাজেক ভূমি রক্ষা কমিটি, ঘিলাছড়ি নারী নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটি ও প্রতিরোধ সাংস্কৃতিক স্কোয়াড।

কনভেনশনে বক্তারা বলেন, একতরফাভাবে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে আওয়ামী লীগ সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামে ফ্যাসিবাদী নীতি অব্যাহত রেখেছে। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারা দেশের সংখ্যালঘু জাতিসমূহকে বাঙালি বানিয়েছে।  বক্তারা অভিযোগ করে বলেন, দীঘিনালার বাবুছড়ায় বিজিবি ব্যাটালিয়ন সদর দপ্তর স্থাপনের মাধ্যমে পাহাড়িদের নিজ বসতভিটা থেকে উচ্ছেদ এবং তদেকমারা কিজিং ও সাজেকে বুদ্ধমূর্তি স্থাপন ও ভাবনা কেন্দ্র নির্মাণে সরকার বাধা দিচ্ছে। অন্যদিকে বান্দরবানের রুমা, নাইক্ষ্যংছড়ি সহ পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন জায়গায় পাহাড়ি উচ্ছেদের নানা চক্রান্ত চালানো হচ্ছে। কিছুদিন আগে সরকারের যোগাযোগ মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের রাঙামাটিতে এসে পার্বত্য চট্টগ্রামে রক্ত আর বারুদের গন্ধ পাচ্ছেন বলে উস্কানি ও চক্রান্তমূলক বক্তব্য দিয়েছেন।

বক্তারা আরো বলেন, শাসকগোষ্ঠি রাজনৈতিক হীনস্বার্থ চরিতার্থ করার লক্ষ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামে নতুন করে ৩০ হাজার সেটলার বাঙালিকে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিয়েছে। যার মাধ্যমে সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে পাহাড়ি জনগণকে নিজ নিজ জায়গা-জমি থেকে উচ্ছেদের পাঁয়তারা করছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে ভুমি রক্ষার জন্য ঐক্যবদ্ধ ভাবে আন্দোলন করার জন্য বক্তারা সকলের প্রতি আহ্বান জানান।

কনভেনশনের দ্বিতীয় অধিবেশনে ৮গণসংগঠনের কার্যক্রম সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনার জন্য ১৭ সদস্য বিশিষ্ট একটি আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে সোনালী চাকমাকে আহ্বায়ক ও অংগ্য মারমাকে সদস্য সচিব নির্বাচিত করা হয়। কনভেনশন শেষে সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট থেকে একটি র‌্যালি বের করা হয়। র‌্যালিটি নারিকেল বাগান ঘুরে চেঙ্গী স্কোয়ারে সংক্ষিপ্ত সমাবেশের পর আবার সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটে এসে শেষ হয়।

বিবৃতিতে  আরও বলা হয়, কনভেনশনে রাজনৈতিক প্রস্তাব পাঠ করেন পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি থুইক্যচিং মারমা। এরপর উত্থাপিত রাজনৈতিক প্রস্তাবটি হাত উচিয়ে সর্বসম্মতিক্রমে পাশ করা হয়। এছাড়া কনভেনশনে ১১ দফা দাবিও গৃহীত হয়েছে। সেগুলোর মধ্যে হচ্ছে তদেকমারা কিজিং-উজো বাজার-বেতছড়িসহ যে সকল স্থানে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মূর্তি ধর্মীয় প্রতিকৃতি স্থাপনের প্রক্রিয়াধীন রয়েছে, তাতে সরকার-প্রশাসনের হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে। সকল জাতিসত্তার স্ব স্ব ধর্ম পালনের অধিকার দেয়া,পাহাড়িদের প্রথাগত ভূমি অধিকারের স্বীকৃতি দিতে হবে। পর্যটনের নামে সাজেকে পাহাড়ি উচ্ছেদপূর্বক সেটলার পুনর্বাসনের গোপন পরিকল্পনা বাতিল করতে হবে। বান্দরবানের নাক্ষ্যংছড়ি-রুমা, খাগড়াছড়ির রামগড়-মানিকছড়ি-মাটিরাঙ্গা-গুইমারা ও রাঙ্গামাটির লংগুদুসহ যে সকল স্থানে সেনা-বিজিবি ও অন্যান্য বাহিনীর গ্যারিসন-ক্যাম্প সম্প্রসারণ-নির্মাণ, তথাকথিত বনায়ন ইত্যাদি কার্যক্রম চলছে তা বন্ধ করা, তথাকথিত ‘পাহাড়ি ব্যাটেলিয়ন’-এর নামে বিতর্কিত র‌্যাব মোতায়েনের সিদ্ধান্ত বাতিলপূর্বক সংস্থাটি বিলুপ্ত করতে হবে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার্থে মিশ্র পুলিশবাহিনী চালু এবং পাহাড়ি জনগণের মধ্যে থেকে কমিউনিটি পুলিশ ও আনসার-ভিডিপি গঠনের অনুমোদন দিতে হবে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং মেডিক্যাল কলেজ স্থাপনের পরিবর্তে পার্বত্য চট্টগ্রামে মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিতকরণসহ পিসিপি’র শিক্ষা সংক্রান্ত ৫ দফা দাবি মেনে নিয়ে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা উন্নত করার পদক্ষেপ নিতে হবে। এছাড়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং মেডিকেল কলেজ এর নামে সেটলার পূনর্বাসনের ষড়যন্ত্র বন্ধ করা, স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা ও রাজনৈতিক সমাধানের লক্ষ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে পর্যায়ক্রমে সেনা-সেটলার প্রত্যাহার করতে হবে,তিন পার্বত্য জেলা পরিষদে সরকার দলীয় লোক পুনর্বাসনের ষড়যন্ত্র স্থগিত করে অনতি বিলম্বে জেলা পরিষদ নির্বাচনের তফশিল ঘোষণা করা, ধর্ষণের মেডিক্যাল রিপোর্ট প্রদানে গোপন সরকারি নির্দেশনা প্রত্যাহার করে খাগড়াছড়িতে সবিতা চাকমা, ভারতী চাকমা, রচনাদেবী ত্রিপুরাসহ এ যাবতকালে ধর্ষিত নারীদের রিপোর্ট পুনঃতদন্ত ও দুর্বৃত্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।

সমতলে আদিবাসী নারী নেত্রীকে ধর্ষণকারীকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান সহ সারাদেশে নারী নির্যাতন বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ,নেয়া, ঢাকায় তোবা গ্রুপের শ্রমিকসহ সকল শ্রমিকদের নায্য দাবি মেনে নিয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর নগ্ন হামলায় জড়িত পুলিশদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে, পার্বত্য চট্টগ্রামের নেত্রী ‘‘কল্পনা চাকমার” অপহরণের তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ করতে হবে এবং অপহরণকারী লে.ফেরদৌসসহ অপহরণে জড়িত সকলকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে এবং পূর্ণস্বায়ত্বশাসনের দাবী অবিলম্বে মেনে নিয়ে সরকারকে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রকৃত রাজনৈতিক সমাধান করতে হবে।

–হিলবিডি২৪/সম্পাদনা/সিআর

Print Friendly