খাগড়াছড়িতে জেলা বিএনপির র্শীষ দুই নেতাকে বহিস্কার

খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি, হিলবিডিটোয়েন্টিফোর ডটকম

bnphillbd24.com

খাগড়াছড়ি জেলা বিএনপির শীর্ষ দুই নেতাকে বহিস্কার করা হয়েছে। এরা হলেন জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি সহ-সভাপতি মনীন্দ্র লাল ত্রিপুরা ও আমিন শরীফ সওদাগর। গত বৃহস্পতিবার কেন্দ্রীয় বিএনপি’র দপ্তর সম্পাদক রুহুল কবির রিজভী’র স্বাক্ষরিত চিঠিতে  তাদের বহিস্কার করা হয়েছে। ফলে এ নিয়ে খাগড়াছড়ির জেলা বিএনপিতে চলছে অস্থিরতা।

এদিকে,বহিষ্কৃত দুই দুই দ্ব্যর্থহীন ভাষাই বলেছেন,ওয়াদুদ ভুইঁয়ার স্বেচ্ছাচারিতা-চাঁদাবাজী আর একনায়কতন্ত্রের বিরোধীতা করায় তিনি (ওয়াদুদ) কেন্দ্রকে ভুল বুঝিয়ে তাঁদের বহিস্কার করা হয়েছে।

জেলা বিএনপির একাধিক সূত্রে জানা গেছে, বহিস্কৃত এই দুই নেতার মধ্যে মনীন্দ্র লাল ত্রিপুরা গত বুধবার ঢাকায় ওয়াদুদ ভূইয়া’র অন্যতম রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ সমীরণ দেওয়ান (কেন্দ্রীয় বিএনপি’র নির্বাহী সদস্য ও সাবেক জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান)-এর সাথে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অবঃ) হান্নান শাহ এবং কেন্দ্রীয় ভাইস্-চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল নোমানের সাথে পৃথকভাবে দেখা করেন। এছাড়া অপর বহিস্কৃত নেতা আমিন শরীফ সওদাগর গত বৃহস্পতিবার সকালেও খাগড়াছড়ি জেলাসদরে কেন্দ্রীয় কর্মসূচীর অংশ হিসেবে জেলা বিএনপি আয়োজিত বিক্ষোভ মিছিল ও জেলা প্রশাসক কার্যালয় ঘেরাও কর্মসূচীতে অংশ নেন।

অপরদিকে গত ১৯ ফেব্রুয়ারী অনুষ্ঠিত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে রামগড় ও মানিকছড়ি উপজেলায় চেয়ারম্যান প্রার্থী মনোনয়নকে কেন্দ্র করে জেলা বিএনপি’র সভাপতি ওয়াদুদ ভূইয়া গত ১৫ ফেব্রুয়ারী বিদ্রোহী প্রার্থীতার অভিযোগে নিজের বড় ভাই বেলায়েত হোসেন ভূইয়াকে বহিস্কার করেন।  একইসময় বহিস্কার করেন, মানিকছড়ি উপজেলা নির্বাচনে চেয়ারম্যান প্রার্থী এস এম রবিউল ফারুককে। সেই নির্বাচনে অল্পভোটের ব্যবধানে তাঁর (ওয়াদুদ) আরেক ভাতিজা শহীদুল ইসলাম ভূইয়া ফরহাদ চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হলেও মানিকছড়িতে গো-হারা হারেন এনামুল হক।

সূত্র আরও জানায়, সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার বিকেলে জেলা বিএনপি’র পক্ষ থেকে বহিস্কার করা হয় দীঘিনালা উপজেলা বিএনপি’র সাংগঠনিক সম্পাদক নুরুল ইসলাম বাচাকে। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি দীঘিনালার উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে দল সমর্থিত প্রার্থীর বিপরীতে আওয়ামীলীগ প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

জানা যায়, ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এমপি হবার সুবাদে তিনি ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড’-র চেয়ারম্যান মনোনীত হন। ক্ষমতার অপ-ব্যবহার, নিজ দলের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এবং বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের ওপর নানামুখী নিপীড়ন, সাংবাদিকদের দমন-পীড়ন, টেন্ডারবাজী-স্বজনপ্রীতিসহ নানা অভিযোগে সমালোচিত হয়ে উঠেন। জরুরী অবস্থা সরকারের সময় শুরুতেই ২০০৭ সালের ৩ ফেব্রুয়ারী যৌথবাহিনীর হাতে আটক হন ওয়াদুদ ভূইয়া। দুর্নীতি ও অবৈধ পন্থায় অর্থ উপার্জনের দায়ে তিনি ২০ বছরের সাজা’র দন্ড মাথায় নিয়ে জেল খাটেন ২০০৯ সালের জানুয়ারী পর্যন্ত। জেলে থাকাকালীন সময়ে অনুষ্ঠিত অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি মনোনয়নপত্র জমা দিলেও তা খারিজ হয়ে যায়। পরে দলের পক্ষ থেকে ‘ধানের শীষ’ প্রতীকের মনোনয়ন দেয়া হয়, সাবেক জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান সমীরণ দেওয়ানকে। তিনি ১৯৯১ সালে বিএনপিতে যোগদান করেছিলেন।

সূূত্র মতে, বিগত ২০০৯ সালের ২৫ নভেম্বর খাগড়াছড়ি আলুটিলায় অনুষ্ঠিত জেলা বিএনপি’র সম্মেলনে ওয়াদুদ ভূইয়া-সভাপতি এবং আবু ইউসুফ চৌধুরী-সাঃ সম্পাদক নির্বাচিত হন। সম্মেলনের পর তিনি মাত্র দুইবার খাগড়াছড়ি আসেন। একবার মামলার হাজিরা দিতে আরেকবার মাটিরাঙ্গা উপজেলা বিএনপি’র সভাপতি আব্দুল মোনাফের নামাজে জানাজায় যোগ দিতে। সেই কমিটির গুরুত্বপূর্ন সহ-সভাপতি বেলায়েত হোসেন ভূইয়া (ওয়াদুদ ভূইয়া’র বড়োভাই), সাবেক জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মনীন্দ্র লাল ত্রিপুরা এবং আমিন শরীফ সওদাগরকেই বহিস্কার করা হল ধাপে ধাপে। তাই এক মাসের ব্যবধানে বহিষ্কৃত সব নেতাই অভিযোগ করেছেন, ওয়াদুদ ভূইয়া;দলে নিজের একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা এবং মাঠে থাকা নেতাদের অবস্থান দুর্বল করতে কেন্দ্রকে ভুল বুঝিয়ে বহিস্কারের তালিকা দীর্ঘ করছেন।বিষয়টিকে দলের জন্য নেতিবাচক পদক্ষেপ বলে মনে করছেন অধিকাংশ নেতাকর্মী।

এ বিষয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন জেলা বিএনপি’র সহ-সভাপতি কংচাইরী মাষ্টার, পৌর বিএনপি’র সভাপতি আব্দর রব রাজা, জেলা কৃষকদলের সভাপতি এম এ হান্নান, জেলা বাস্তুহারা দলের সভাপতি নুরুল আলম এবং জেলা মৎস্যজীবি দলের সাঃ সম্পাদক রিয়াজ হোসেন। তাদের মতে, দলের বৃহত্তর ঐক্য, গণতান্ত্রিক সহাবস্থান এবং সরকার বিরোধী আন্দোলনের প্রয়োজনে জেলার প্রকৃত অবস্থা বুঝতে কেন্দ্রীয় বিএনপি’র বিশেষ টিম আসারও প্রয়োজনবোধ করছেন।

বহিষ্কৃত জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি বেলায়েত হোসেন ভূইয়া, মনীন্দ্র লাল ত্রিপুরা এবং আমিন শরীফ সওদাগর জানিয়েছেন, তিনি(ওয়াদুদ) আপাদমস্তক একজন স্বৈরাচারী ও কর্তৃত্ব পরায়ণ ব্যক্তি। দলকে তিনি যুগের পর যুগ নিজের স্বার্থেই ব্যবহার করে চলেছেন। যাঁদের কারণে ২০০১ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত দলের সুনাম নষ্ট হয়ে ছিল সেই আফছার-মিল্লাতরাই এখন দলের হর্তাকর্তা। আমরা সবাই দলের দুঃসময়ে জেল-জুলুম খেটেছি, এখনও হামলা-মামলার মুখোমুখি হয়ে রাজপথে আছি। আর ওয়াদুদ ভূইয়া ঢাকা আর ফেনী বসে বসে চাঁদাবাজী অব্যাহত রেখেছেন।

তারা আরও অভিযাগ করেন সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর (ওয়াদুদ) ঘরানার তোষামোদকারী ও সুবিধাভোগী কতিপয় নেতা আওয়ামীলীগের সাথে সমঝোতার ভিত্তিতে টেন্ডারবাজী শুরু করেছে। সেই টেন্ডারবাজীর বিরুদ্ধে আমরা কথা বলেছি। কিন্তু ওয়াদুদ ভূইয়া সেই টেন্ডারবাজীর ভাগ পান বলে আমাদের বিরুদ্ধে কেন্দ্রকে প্রভাবিত করে বহিষ্কারের খড়গ বসিয়েছেন।

তবে ওয়াদুদ ভূইয়া’র বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ উঠলেও তাঁর কোন প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে কথা বলার জন্য তাঁর মোবাইল ফোনে (নম্বর-০১৭১৩-৪৫৯৭১০) বার বার ফোন দেয়া হলেও কোন সাড়া পাওয়া যায়নি। তবে ওয়াদুদ ভূইয়া’র অতি ঘনিষ্টমিত্র ও জেলা বিএনপি’র সাংগঠনিক সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান মিল্লাত জানান, তিনি সরকারের রোষানলে পড়ার ভয়ে গা-ঢাকা দিয়েছেন। তাই তাকে ফোনে পাওয়া যাচ্ছে না।

–হিলবিডি২৪/সম্পাদনা/সিআর.

Print Friendly