কাপ্তাই হ্রদে মৎস্য উৎপাদন হুমকির মুখে

বিশেষ রিপোর্টার, হিলবিডিটোয়েন্টিফোর ডটকম
Dec 29,07 001

হ্রদের গভীরতা হ্রাস, পানি ও পরিবেশ দূষণ, প্রজনন মৌসুমে অবাধে ডিমওয়ালা ও পোনা মাছ নিধন, নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল ব্যবহারসহ যত্রতত্র মাছ শিকার এবং মাছের অভয়ারণ্য ধ্বংস হওয়ায় মানব সৃষ্ট কাপ্তাই হ্রদে মৎস্য উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে। ইতিমধ্যে রুই, মহাশোল, পাঙ্গাস চিতলসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। ফলে কাপ্তাই হ্রদে মৎস্য সম্পদ হুমকির মুখে রয়েছে।
উল্লেখ্য, ১৯৬১ সালে কর্ণফুলীর খরস্্েরাতা নদীর ওপর বাঁধ নির্মাণ করে গড়ে তোলা হয় কাপ্তাই জলবিদ্যূৎ উৎপাদন কেন্দ্র। এ কৃত্রিম তৈরীর সময় প্রায় ৭০০ বর্গ মাইল এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যায়। ফলে ১ লাখের বেশী পাহাড়ি লোকজন উদ্ধাস্তুতে পরিণত হয়। তবে এ বাঁধের কারণে হ্রদটি বিদ্যুতের পাশাপাশি মৎস্য উৎপাদন করে দেশের মাছের চাহিদা মিটিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন কর্পোরেশন ৯৯ বছর মেয়াদে এ হ্রদটি লিজ নিয়ে ১৯৬৪ সাল থেকে হ্রদ থেকে বাণিজ্যেক ভিত্তিতে মৎস্য আহরণ শুরু  করে।
সংশ্লিষ্ট ও একাধিক সুত্রে জানা গেছে, ১৯৬৫-৬৬ সালেকাপ্তাই হ্রদে রুই, কাতলা, মৃগেল, কালি বাউস, মহাশোলসহ বিভিন্ন বড় প্র্রজাতির মাছ ছিল ৮১.৩৫ শতাংশ এবং চাপিলা, কাচকি, মলা মাছের মতো ছোট প্রজাতির মাছ ছিল তিন শতাংশ। এখন হ্রদে বড় আকারের মাছ কমতে কমতে নেমে এসেছে চার শতাংশে। হ্রদের ৪৮ বছরে ছোট প্রজাতির মাছ বাড়তে বাড়তে এখন নব্বই শতাংশে দাড়িয়েছে। এক হিসাবে দেখা গেছে ১৯৯৭-৯৮ সালে কাপ্তাই হ্রদ থেকে প্রায় ৪৮ মেট্রিক টন রুই জাতীয় মাছ আহরণ করা হয়। কিন্তু ২০০০-২০০১ সালে রুই মাছের আহরণের পরিমাণ দাড়াঁয় তিন শত ১১ মেট্রিক টন। আবার ১৯৯৮-৯৭ সালে হ্রদে রুই জাতীয় মাছের পোনা মজুদের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৬ দশমিক ৫৫ মেট্রিক টন। ২০০০-২০০১ সালে তা নেমে আসে পাঁচ দশমিক ৫৫ মেট্রিক টন।
সুত্র মতে, ১৯৬৫-৬৬ সালে কাপ্তাই হ্রদে বাণিজ্যিকভাবে মৎস্য আহরণের শুরুতে ১২০৬ মেট্রিক টন মাছ আহরিত হয়। সেই সময় কাপ্তাই হ্রদের মৎস্য খাতে সরকারের রাজস্ব আয় ছিল মাত্র তিন লাখ ৫০ হাজার টাকা। আর বর্তমানে হ্রদ থেকে মাছ আহরণ হচ্ছে প্রায় ৬ হাজার মেট্রিক টন। এ খাতে সরকারের রাজস্ব আয় হচ্ছে প্রায় ৩ কোটি টাকা। কিন্তু আশ্চর্যজনক হলেও সত্য কোন না কোনভাবে এই হ্রদে বিস্তার ঘটেছে গ্রাস কার্প, রাজপুঁটি, নাইলোটিকা, সিলভার কার্প, তেলাপিয়া, মোজাম্বিকা তেলাপিয়া, থাই মহাশোল, পিরানহা এবং আফ্রিকান মাগুর। এগুলোর মধ্যে বেশকিছু মাছ বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন কর্পোরেশনের নিজস্ব আমদানি হলেও কাপ্তাই হ্রদে তেলাপিয়া, পিরানহা এবং আফ্রিকান মাগুর কোথা থেকে এসছে তা কেউ বলতে পারছে না। তবে কাপ্তাই হ্রদে পিরানহার অস্তিত্ব রয়েছে তা স্বীকার করতে চান না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
সূত্র আরো জানায়, কাপ্তাই হ্রদ থেকে একেবারে বিলুপ্ত হওয়া মাছের মধ্যে রয়েছে সীলন, দেশী সরপুটি, ঘাউড়া, বাঘাইর, মোহিনী বাটা ও দেশী পাঙ্গাস প্রজাতির মাছ। বিলুপ্ত হওয়ার পথে রয়েছে দেশী মহাশোল, মধু পাবদা, পোয়া, ফাইস্যা, তেলে গুলশা, সাদা ঘনিয়ার মতো প্রজাতির মাছ। অপরদিকে ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে সুস্বাদু মাছের মধ্যে রুই, কাতলা, মৃগেল, পোয়া, বোয়ালী পাবদা ও বড় চিতল প্রজাতির মাছ। কাপ্তাই হ্রদে মাছের এক সময় সমৃদ্ধ ভান্ডার ছিল। এতে দুই প্রজাতির চিংড়ি, এক প্রজাতির ডলফিন, দুই প্রজাতির কচ্ছপসহ মোট ৭৬ প্রজাতির মিঠা পানির মাছ ছিল। এর মধ্যে ৬৮টি প্রজাতির মাছ দেশীয় এবং বাকি ৮ প্রজাতির মাছ বিদেশী। বর্তমানে প্রায় ৪২ প্রজাতির মাছ কাপ্তাই হ্রদ থেকে আহরিত হচ্ছে।
অন্যদিকে প্রতি বর্ষা মৌসুমে মাছের প্রজনন জন্য তিন মাছ আহরণ ও বিপণন বন্ধ থাকলেও ডিমওয়ালা মাছ সুষ্ঠুভাবে মাছের প্রজনন ও বৃদ্ধি ঘটাতে পারে না এক শ্রেনী চোরা কারবারী মৎস্য শিকারীদের কারণে। ফলে সঠিক সময়ে মাছের প্রজনন ও বৃদ্ধি হতে পারে না। অপরদিকে মাছের মাছের বংশ বৃদ্ধি ও প্রজননের জন্য হ্রদে অভয়াণ্য স্থান নির্ধারণ করা হলেও তার সুষ্টু তদারকি ও মৎস্য শিকারী কারণে সেখানে মাছ সুষ্ঠুভাবে প্রজনন ও বংশ বৃদ্ধি ঘটাতে পারে না।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষনা ইনষ্টিটিউট রাঙামাটির এক গবেষনাপত্রে বলা হয়েছে, কাপ্তাই হ্রদে দেশীয় যে সব প্রজাতির মাছ রয়েছে সেগুলো সংরক্ষণ ও সম্প্রসারনের ভূমিকা অতি দ্রুত নেয়া উচিত এবং সংরক্ষণ না করার কারণে অনেক দেশীয় প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত হচ্ছে। ওই গবেষনা পত্রে দেশীয় প্রজাতির মাছের প্রজাতি রার স্বার্থে হ্রদ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমকে আরো শক্তিশালী এবং হ্রদে মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন ত্রেগুলো পুনরুজ্জিত করার ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণের উপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
মৎস্য গবেষনা ইনষ্টিটিউটের নদী উপ-কেন্দ্রের রাঙামাটির এক কর্মকর্তা বলেন, কাপ্তাই হ্রদে এসব দেশীয় প্রজাতির মাছের কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ হল প্রাকৃতিক প্রজনন ক্ষেত্রগুলো বিনষ্ট ও স্থানান্তরিত করায়, ডিম ওয়ালা মাছ ব্যাপকহারে নিধন এবং হ্রদে পোনা ছাড়ার পর পর এলাকার লোকজন সেগুলো ধরে বিক্রি করা, অবাধে কারেন্ট জাল ব্যবহার এবং হ্রদের সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়নের অভাব রয়েছে।
–হিলবিডি২৪/সম্পাদনা/সিআর.

Print Friendly