এক বছরে আদিবাসী নারী ৭জনসহ ১৫জনকে হত্যাঃ ১২৬জন শারিরীকভাবে নির্যাতনের শিকার

ডেস্ক রিপোর্ট,হিলবিডিটোয়েন্টিফোর ডটকম

Picture1

২০১৪ সালে আদিবাসী নারী ৭জনসহ মোট ১৫জনকে হত্যা করা হয়েছে এবংঅন্তত ১২৬জন আদিবাসীকে শারিরীকভাবে নির্যাতন করা শিকার হয়েছে। আদিবাসীদের উপর ৭টি সাম্প্রদায়কি হামলা এবং বাড়িঘর ও সম্পত্তি লুট করা হয়েছে। এছাড়া ১২২ জন আদিবাসী নারী ও শিশু যৌন ও শারীরিক সহিংসতার শিকার হয়। শুধুমাত্র নারীদের উপর ৭৫টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।

শুক্রবার ঢাকায় বাংলাদেশের আদিবাসীদের মানবাধিকার রিপোর্ট ২০১৪ প্রকাশ ও মোড়ক উন্মোচন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।

কাপেং ফাউন্ডেশনের মানিক সরেনের স্বাক্ষরিত এক প্রেস বার্তায় বলা হয়েছে, দি ডেইলি স্টার ভবনের তৌফিক আজিজ খান সেমিনার হলে আয়োজিত ইউরোপিয়ন ইউনিয়ন ও অক্সফারে সহযোগিতায় কাপেং ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে প্রতিবছরের ন্যায় আদিবাসীদের মানবাধিকার বিষয়ক বার্ষিক রিপোর্ট করেছে। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কাপেং ফাউন্ডেশনের চেয়ারপার্সন রবীন্দ্রনাথ সরেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বিশিষ্ট মানবাধিকারকর্মী ও আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক সুলতানা কামাল। সম্মানিত অতিথি ছিলেন হাজেরা সুলতানাএমপি, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং। স্বাগত বক্তব্য রাখেন কাপেং ফাউন্ডেশনের ভাইস চেয়ারপার্সন চৈতালী ত্রিপুরা। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন কাপেং ফাউন্ডেশনের হিরন মিত্র চাকমা। করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে কাপেং ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক পল্লব চাকমা ২০১৪ সালে ঘটে যাওয়া আদিবাসীদের উপর মানবধিকার রিপোর্ট তুলে ধরেন।

রিপোর্টে বলা হয়, ২০১৪ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রায় ৩ হাজার ৯১১ একর ভূমি সরকারি ও বেসরকারি ব্যক্তি কর্তৃক অধিগ্রহণ এবং সেখানে ৮৪ হাজার ৬৪৭ একর ভূমি জবর খল ও অধিগ্রহণের জন্য প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। সমতলে বছর ব্যাপী ১০২টি আদিবাসী পরিবার নিজেদের ভিটে মাটি থেকে উচ্ছেদের শিকার হয়েছেএবং ৮শ ৮৬টি পরিবার উচ্ছেদের হুমকির মধ্যে রয়েছে। যাদের মধ্যে রয়েছে সমতলের ৩শ পরিবার। পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, অভ্যন্তরীন উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনসহ চুক্তির মূল বিষয়গুলো গত ১৭ বছরেও বাস্তবায়ন করা হয়নি। সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক ভূমি কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতি সরকার দিলেও এখন পর্যন্ত এব্যাপারে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি।

রিপোর্টে আরও বলা হয়, বাংলাদেশে বাঙালি ছাড়াও ৫৪টির অধিক আদিবাসী জাতি বসবাস করলেও সংবিধানে এসব নৃতাত্ত্বিক, ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক সংখ্যালঘুদেরকে আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। ২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকার আদিবাসীদেরকে “উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠীও সম্প্রদায়” হিসেবে অভিহিত করেছে। সেই সাথে বাংলাদেশের জনগণকে জাতি হিসেবে বাঙালী পরিচিতি প্রদান করার ফলে এসব আদিবাসী জাতিসমূহকেও‘বাঙালি’হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। অধিকন্তু ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে উল্লেখিত‘আদিবাসী’শব্দটিরপরিবর্তে ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময়ে নির্বাচনী ইশতেহারে ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগ আদিবাসীদেরকে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও ট্রাইবাল হিসেবে অভিহিত করেছে।

রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশের আদিবাসীদের নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার লঙ্ঘনের হার তুলনামূলকভাবে বেড়ে গেছে। বাঙালী সেটেলার এবং ভূমি দস্যুরা আদিবাসীদের উপর ৭টি সাম্প্্রদায়িক হামলা সংঘটিত করেছে এবং তাদের বাড়ি এবং সম্পত্তি লুট করেছে। অন্তত ৮জন আদিবাসীকে হত্যা করা হয়েছে (যৌন সহিংসতায় ৭জন আদিবাসী নারী হত্যা ছাড়াও) এবং৫ জন আদিবাসীকে গ্রেফতার করা হয়েছে যাদেরসাজানো মামলায় আসামী বানানো হয়েছে।একই সময়ে অন্তত ১২৬জন আদিবাসীকে শারিরীকভাবে নির্যাতন করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে স্বীকৃত আদিবাসীদের প্রথাগত ভূমি অধিকার বাংলাদেশ সরকার সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করে চলেছে অভিযোগ করে রিপোর্টে আরও বলা হয়, এর ফলে শুধু আদিবাসীদের প্রথাগত ভূমি অধিকার উপভোগের ক্ষেত্রে বাধা গ্রস্তই করা হচ্ছে না, সেই সাথে ভূমিকে কেন্দ্র করে প্রায়ই আদিবাসী ও মূলধারার বাঙালি ভূমিদুস্যদের মধ্যে সহিংসতা বাড়ছে। ২০১৪ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রায় ৩,৯১১ একর ভূমি সরকারি ও বেসরকারি ব্যক্তি কর্তৃক অধিগ্রহণ করা হয়েছে এবং সেখানে ৮৪,৬৪৭ একর ভূমি জবরদখল ও অধিগ্রহণের জন্য প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। বনবিভাগ কর্তৃক ৮৪,৫৪২ একর ভূমিরক্ষিত (রিজার্ভ) ও সংরক্ষিত বনাঞ্চল ঘোষণা করে জুম্মদের জুম ও মৌজা ভূমি দখলের প্রক্রিয়া চলছে। সমতলে বছর ব্যাপী ১০২টি আদিবাসী পরিবার নিজেদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদের শিকার হয়েছে এবং ৮৮৬টি পরিবার উচ্ছেদের হুমকির মধ্যে রয়েছে, যাদের মধ্যে রয়েছে সমতলের ৩০০ পরিবার। আদিবাসীদের ভূমি দখলের উদ্দেশ্যে সমতল অঞ্চলের ৮৯টি এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের ৬৪টি আদিবাসী পরিবার ভূমিদস্যু কর্তৃক সংঘটিত আক্রমণের শিকার হয়েছে। ভূমি সংক্রান্ত সাজানো মামলায় ১০ জন আদিবাসীকে পুলিশ কর্তৃক গ্রেফতার করা হয়েছে। অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামে ১০৬জন ও সমতল অঞ্চলে ৪৪জনসহ মোট ১৫০ জন আদিবাসীর বিরুদ্ধে মিথ্যা ও বানোয়াট মামলা দায়ের করা হয়েছে।

রিপোর্টে আদিবাসী নারী ও শিশুদের অধিকারের পরিস্থিতি পর্যালোচনায় বলা হয়, আদিবাসীদের মধ্যে নারীরাসবচেয়ে বেশি বৈষম্যের শিকার হয়। ২০১৪ সালে ১২২ জন আদিবাসী নারী ও শিশু যৌন ও শারীরিক সহিংসতার শিকার হয়। ২০১৪ সালে আদিবাসী নারীদের উপর সহিংসতার ঘটনা মোট ৭৫ টি ঘটেছে। ৭৫ টি ঘটনার মধ্যে ৫১ টি ঘটনা পার্বত্য চট্টগ্রামে ও বাকি ২৪ টি সমতলে। ২০১৩ সালে মোট ৬৭ জন নারী সহিংসতার শিকার হয়। গত বছরের তুলনায় এ বছর সহিংসতার মাত্রা দ্বিগুণ বেড়েছে।ব্যাপক মাত্রায় আদিবাসী নারী ও শিশুদের উপর যৌন হয়রানি বৃদ্ধি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে উদ্বেগজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। ২০১৪ সালে৭ জন আদিবাসী নারী ও শিশুকে ধর্ষনের পর হত্যা করা হয়েছে। এছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামে১২ জন এবং সমতল অঞ্চলে ৭ জনসহ মোট ২১ জন আদিবাসী নারী ও শিশু ধর্ষণ ও গণধর্ষণের শিকার হয়েছে। ৬২ জন আদিবাসী নারী ও শিশু অন্যান্য মানবাধিকার লঙ্ঘন যেমন শারিরীক লাঞ্চনা/যৌন হয়রানি ইত্যাদির শিকার হয়েছে। তাছাড়া ২২ জন আদিবাসী নারী ও শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে এবং ১০ জনকে অপহরণ ও অপহরণের চেষ্টা করা হয়েছে। এছাড়া রিপোর্টে পার্বত্য চুক্তির ১৭ বছরেও পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির মূল বিষয়গুলো বাস্তবায়নের জন্য কোনরূপ পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি বলা হয়েছে।

রিপোর্টে ৫ দফা সুপারিশ তুলে ধরা হয়। সেগুলো হল সুনির্দিষ্ট সময়সূচি ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা(রোডম্যাপ) ঘোষণা করে চট্টগ্রাম চুক্তি পূর্ণ বাস্তবায়নের কার্যকর ব্যবস্থা, পার্বত্য কমিশন আইন সংশোধন, সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক ভূমি কমিশন গঠন করে বেদখল হওয়া ভূমি পুনরুদ্ধার,সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও আদিবাসী নারী ও কন্যা শিশুদের বিরুদ্ধে শারীরিক নির্যাতন বন্ধ ও বিচার বিভাগীয় তদন্ত করা, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান,এবং নিয়মিতভাবে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন কর্তৃক আদিবাসীদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা তদন্ত করা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সুলতানা কামাল বলেন, সমতল এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন জায়গায় আমি নিজে আদিবাসীদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা সরেজমিনে দেখে এর সত্যতা পেয়েছি। তবে আশঙ্কা করতেই হয় যে আদিবাসীদের উপর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোর কোন বিচার হবে কিনা। শুধু তাই নয় যারা আদিবাসীদের জন্য কাজ করে তাদের উপরও কোন ধরনের হামলা হলে সেটিরও বিচার হবে কিনা সন্দেহ থেকেই যায়। তিনি হতাশা প্রকাশ করে বলেন, রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা আদিবাসী, বাঙালি সকলে মিলে যে দেশ স্বাধীন করেছি আজ স্বাধীনতার ৪৩ বছরপরেও আদিবাসীদের অধিকারকে স্বীকৃতি দিতে পারেনি। বরং তাদের মানবাধিকারকে এই রাষ্ট্র ও কিছু স্বার্থন্বেষী মানুষ প্রতিনিয়ত পদদলিত করছে। তিনি পার্বত্য চট্ট্রগাম চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এবং সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক ভূমিকমিশন গঠন করার জন্য সরকারের প্রতি দাবি জানান।

হাজেরা সুলতানা এমপিবলেন, আদিবাসীদের জীবন ভূমিকে নিয়েই। এখন যেভাবে আদিবাসীদেরকে জমি থেকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে তাতে করে তারা কিভাবে বাঁচবে? সরকার পার্বত্য চুক্তির বিভিন্ন ধারা বাস্তবায়ন করছে, কিন্তু ভূমি বিষয়টা বাদ দিয়ে সরকারের কোন উন্নয়ন কার্যক্রম নিয়ে লাভ হবে না। তিনি ভূমি বিষয়ে আন্তরিকভাবে কাজ করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

সঞ্জীব দ্রং বলেন, যে কোন ধরনের অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে দেশের সংখ্যালঘূ, আদিবাসী মানুষদের প্রতি নির্যাতন-নিপীড়নের ঘটনা বেড়ে যায়। বছরের শুরু থেকে আদিবাসীদের উপর একর পর এক সহিংসতার ঘটনা ঘটে যাচ্ছে। আজকে আমরা আদিবাসীরা আমাদের উপর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো প্রকাশ করছি। রাষ্ট্র নিশ্চয় এগুলো ইতিবাচকভাবে দেখবে এবং আদিবাসীদের মানবাধিকাররক্ষার ব্যবস্থা নেবে।

সভাপতির বক্তব্যে রবীন্দ্রনাথ সরেন বলেন, আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধারা এখন দেশত্যাগ করছে। কখন একজন মুক্তিযোদ্ধা দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়? আদিবাসীদের উপর এভাবে নির্যাতন নিপীড়ন চললে আগামীতে আরো অনেক আদিবাসী দেশ ত্যাগ করবে বলে তিনি শঙ্কা প্রকাশ করেন। আদিবাসীদের প্রতি মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার এবং অপরাধীদের দায়মুক্তির সংস্কৃতি থেকে সরকার এবং প্রশাসনকে বের হয়ে এসে অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিতের দাবি জানান তিনি।
–হিলবিডি২৪/সম্পাদনা/সিআর.

Print Friendly