উত্তরবঙ্গের আদিবাসীদের উপর সহিংসতা, উচ্ছেদ, হত্যা, ধর্ষণের প্রতিবাদে ও নিরাপত্তার দাবিতে ঢাকায় সংবাদ সন্মেলন

ডেস্ক রিপোর্ট,হিলবিডিটোয়েন্টিফোর ডটকম

Picture1

উত্তরবঙ্গের আদিবাসীদের উপর চলমান সহিংসতা, উচ্ছেদ, হত্যা, ধর্ষণের প্রতিবাদ ও নিরাপত্তার দাবিতে মঙ্গলবার ঢাকায় সংবাদ সন্মেলনের আয়োজন করা হয়।

জাতীয় আদিবাসী পরিষদের তথ্য ও গবেষনা সম্পাদক মানিক সরেনের স্বাক্ষরি একপ্রেস বার্তায় বলা হয়, জাতীয় আদিবাসী পরিষদ ও কাপেং ফাউন্ডেশন এর যৌথ উদ্যোগে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির গোলটেবিল মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলন লিখিত বক্তব্যে পাঠ করেন জাতীয় আদিবাসী পরিষদের সভাপতি রবীন্দ্রনাথ সরেন। আদিবাসীদের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে বক্তব্য রাখেন পঙ্কজ ভট্টাচার্য্য, সভাপতি, ঐক্যন্যাপ; আনিসুর রহমান মল্লিক, পলিটব্যুরো সদস্য, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি; রুহীন হোসেন প্রিন্স, কেন্দ্রীয় সদস্য, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি;  সঞ্জীব দ্রং, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম; নুমান আহমদ খান, নির্বাহী পরিচালক, আইইডি। এসময় আরো উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির নেতা দীপায়ন খীসা, মধূপুর অঞ্চলের আদিবাসী নেতা অজয় এ মৃ, বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক পাভেল পার্থ, আদিবাসী সংগঠক ও মানবাধিকার কর্মী হিরণ মিত্র চাকমা, জাতীয় আদিবাসী পরিষদের তথ্য ও গবেষনা সম্পাদক মানিক সরেন, দপ্তর সম্পাদক সূভাষ চন্দ্র হেমব্রম, আদিবাসী নারী নেটওয়ার্কের সদস্য সচিব চঞ্চনা চাকমা, আদিবাসী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি অনন্ত ধামাই, আদিবাসী ছাত্র পরিষদের সভাপতি বিভূতি ভূষণ মাহাতো প্রমুখ। সঞ্চালনা করেন কাপেং ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক পল্লব চাকমা।

সংবাদ সন্মেলনে লিখিত বক্তব্যে রবীন্দ্র নাথ সরেন বলেন, উত্তরবঙ্গের ২ জন আদিবাসীকে হত্যা, ১জন সাঁওতাল মেয়েকে বাড়ী থেকে তুলে নিয়ে ধর্ষণ, ১ জন আদিবাসী গৃহবধূকে ধর্ষণের চেষ্টা, একটি পরিবারের সাথে জমিজমার গন্ডগোলের সূত্র ধরে পুরো গ্রামের (চিড়াকূটা) ৬০টি সাঁওতাল বাড়িতে হামালা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ করাসহ  এই বছরের দুই মাস যেতে না যেতেই আরো অনেক সহিংসতার ঘটনা আদিবাসীদেরকে শঙ্কিত ও প্রচন্ড নিরাপত্তাহীনতায় ফেলে দিয়েছে। আদিবাসীরা তাই নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে দেশান্তরিত হতেও বাধ্য হচ্ছে।

লিখিত বক্তব্যে তিনি আরও বলেন, উত্তরবঙ্গের আদিবাসীদের উপর নির্যাতন-নিপীড়ণ, মারপিট, উচ্ছেদসহ সকল ধরনের সহিংসতার পেছনে ভূমি দখলই প্রধান কারণ। সমতল অঞ্চলের আদিবাসীদের ভূমি সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে ভূমি কমিশন গঠনের জন্য সরকার ২০০৮ এবং ২০১৪ সালে যথাক্রমে অনুষ্ঠিত ৯ম ও ১০ম জাতীয় সংসদে নির্বাচনে অঙ্গীকার করেছে। কিন্তু সরকারের পূর্ববর্তী মেয়াদে এ বিষয়ে কোন পদক্ষেপ তো গ্রহণই করেনি, এমনকি কোন আলোচনাও করেনি। গত ১২ জানুয়ারি বর্তমান মেয়াদে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা গ্রহণের পর সরকার এ বিষয়ে এখনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। যার কারণে ভূমি কেন্দ্রকি সমস্যাগুলো দিন দিন আরো জটিল হয়ে পড়ছে এবং আদিবাসীদের উপর সহিংসতাও বৃদ্ধি পাচ্ছে।  সংবাদ সন্মেলনে উল্লেখ করা হয়, সমতলে ১ জন আদিবাসীকে হত্যা, ৪২ জনকে নির্যাতন ও মারপিট, ৪টি সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা, ১০টি লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে এবং ৩০৯টি পরিবার উচ্ছেদ প্রক্রিয়ায় আছে। এছাড়া এখানে আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, বিশেষ করে রাজশাহীর গোদাগাড়ী অঞ্চলের আদিবাসীরা দিন দিন দেশান্তরিত হওয়ার পথে ঝুঁকছে। গত বছর প্রায় ৩০০ পরিবার দেশান্তরিত হয়েছে। বর্তমান অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতি আর চরম বিচারহীনতার সংস্কৃতি আদিবাসীদের আরো প্রান্তিক ও নিঃস্ব করে দিয়েছে। আদিবাসীদের প্রতি রাষ্ট্রের বিমাতাসুলভ আচরণ, নিরাপত্তা দিতে ব্যার্থ হওয়া, বিচার-আচারে ন্যায় বিচার না পাওয়া, জাতিগত বৈষম্যের শিকার হওয়াসহ নানা কারনে আদিবাসীরা বাংলাদেশে নিরাপত্তাহীনতায় ভূগছে। ফলে বৃহত্তর রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের অনেক আদিবাসীরা শান্তিময় জীবনযাপনের খোঁজে দেশত্যাগ করতে বাধ্য হচ্ছে।

সংবাদ সন্মেলনে উত্তরবঙ্গসহ সারাদেশের আদিবাসীদের উপর সহিংসতা বন্ধে দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ ও আদিবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আদিবাসীদের উপর সহিংসতার সাথে জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা, সহিংসতার শিকার আদিবাসী নারী, পুরুষ ও শিশুদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ, চিকিৎসা ও আইনী সহায়তা প্রদান, দিনাজপুরের চিড়াকূটা সাঁওতাল গ্রামের আদিবাসীদের যথাযথ পুনর্বাসন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সমতলের আদিবাসীদের জন্য একটি পৃথক ভূমি কমিশন গঠন করা এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন দ্রুত সংশোধন ও কার্যকর করা এবং খাস জমি-জঙ্গল-জলাধার ভূমিহীন ও দরিদ্র আদিবাসীদের মাঝে বন্টনের ব্যবস্থার দাবি-দাওয়া তুলে ধরা হয়।

 সংহতি বক্তব্যে পঙ্কজ ভট্টাচার্য্য বলেন, আদিবাসীদের ব্যাপারে সরকারের চোখে ছানি পড়েছে, যার ফলে সরকার আদিবাসীদের প্রতি চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো দেখতে পাচ্ছেনা। এর ফলে রাষ্ট্রের আদিবাসী, সংখ্যালঘূ, গরীব, শ্রমিক জনগণই সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। একশ্রেণীর মানুষ দেশের বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিতিশীল পরিবেশকে কাজে লাগিয়ে আদিবাসীদের কাছে চাঁদাবাজিও করছে।

তিনি বর্তমান সরকারকে বর্ণবাদী সরকার আখ্যায়িখ করে বলেন, যেখানে সারাদেশের আদিবাসীরা শান্তির সাথে বসবাসের জন্য প্রতিনিয়ত দাবি জানাচ্ছে, সরকারের সাথে আলাপ আলোচনার চেষ্টা করছে সেখানে সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামে দেশী বিদেশী নাগরিকদের প্রবেশাধিকার নিয়ে শর্ত জুড়ে দিয়ে এদেশেরই নাগরিকদের প্রতি বর্ণবাদী আচরণ করছে। তিনি আরও বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় আদিবাসীরাও জীবনবাজি রেখে দেশকে স্বাধীন করার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছে অথছ এই আজ এই স্বাধীন দেশে আজও তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা পায়নি।

আনিসুর রহমান মল্লিক বলেন, আদিবাসীদের সব সমস্যাই ভূমি কেন্দ্রিক। কিন্তু সরকার আদিবাসীদের শত দাবি স্বত্ত্বেও এখনো পর্যন্ত সমতলের আদিবাসীদের জন্য ভূমি কমিশন গঠন করার উদ্যোগ নেয়নি। পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন তৈরি করলেও সেটি যথাযথভাবে কার্যকর করছেনা। তিনি আদিবাসীদের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিসহ আদিবাসীদের প্রতি অন্যায় অত্যাচারের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান।

সঞ্জীব দ্রং বলেন, আমরা বারবার সংবাদ সম্মেলন, মিছিল, মিটিং করে আমাদের দাবি জানাচ্ছি, আমাদের প্রতি অন্যায় অত্যাচারের প্রতিবাদ জানাচ্ছি, কিন্তু সরকার আমাদের কোন কথায় শুনছেনা। তাই আজকে আদিবাসীরা বাধ্য হয়ে নিজ জন্মভূমিতে থাকার সাহস পাচ্ছে না। তিনি রাষ্ট্রকে আদিবাসীদের প্রশ্নে সংবেদনশীল হওয়ার ও আদিবাসীদের ্ও দেশের নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করার দাবি জানান।

রূহীন হোসেন প্রিন্স বলেন, বিচারহীনতার কারণেই আদিবাসীদের প্রতি অন্যায় অত্যাচার, খুন , ধর্ষণ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। মুক্তিযদ্ধের মধ্য দিয়ে আসাম্প্রদায়িক যে রাষ্ট্র তখন গঠন হয়েছিল আজ আমাদের রাষ্ট্র আর সেরকম নেই। যার কারনে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার পর আমাদের দেশের আদিাবসী, সংখ্যালঘুরা আজ সবচেয়ে বেশী নির্যাতনের শিকার।

–হিলবিডি২৪/সম্পাদনা/সিআর.

Print Friendly