মানববর্জ্যে জৈব সার তৈরী!


আলীকদমে ইকো টয়লেট পেয়ে খুশি উপকারভোগিরা

দেশমনি তংচংগ্যা, আলীকদম হিলবিডিটোয়েন্টিফোর ডটকম

Bandarban  okhillbd24.com

বান্দরবানের আলীকদম উপজেলায় ইকো টয়লেট পেয়ে খুশি উপকারভোগিরা। মানববর্জ্যরে (মল-মূত্র) প্রতি মানুষের নেতিবাচক মনোভাব দীর্ঘদিনের। তবে এখন ইকো টয়লেটের মানববর্জ্যে তৈরী হচ্ছে জৈব সার! জমিতে মানববর্জ্য জৈব সারে রূপান্তর করে ফসল উৎপাদন করছেন উপকারভোগিরা।

উপজেলার বাবু পাড়ায় এ ধরণের একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে বেসরকারী সংস্থা সোসাইটি ফর পিপল্স এ্যাকশন ইন চেইঞ্জ এন্ড ইক্যুইটি (স্পেস)। তবে প্রকল্পটি এলাকায় নতুন হওয়ায় স্বাস্থ্য ও পরিবেশসম্মত কিনা তা নিয়ে সংস্থাটির অবহিতকরণ সভায় নানা প্রশ্নের সম্মখীণ হন সংস্থার কর্মকর্তারা। মানববর্জ্যে তৈরী জৈব সারে জীবাণু থাকে না পরীক্ষাগারে প্রমাণিত হয়েছে বলে দাবী সংস্থার কর্মকর্তাদের।

উপজেলার বাবু পাড়ায় মানববর্জ্য দিয়ে তৈরী জৈব সার ব্যবহার করে সংস্থার উপকারভোগিরা শাকসব্জি উৎপাদন করছেন। মানব মল-মুত্র জৈব সার হিসেবে ফসলের ক্ষেতে ব্যবহারের কথা জানিয়েছে বাবুপাড়ার উপকারভোগী উক্যজাই মার্মা। একই পাড়ার উপকারভোগী আথুইশে মারমা ঞোমা মারমা, চাচি মং মারমাসহ অনেকে মানববর্জ্যরে ‘জৈব সার’ দিয়ে ফসল উৎপাদন করছেন।

স্পেসের কর্মকর্তারা জানান, ইউনিসেফের সহযোগিতায় স্পেস ইকো টয়লেট নির্মাণ প্রকল্পটি হাতে নেয়। পরীক্ষামূলকভাবে সরকার ও ইউনিসেফের অর্থে সেওয়া-বি প্রকল্পের মাধ্যমে স্পেস ২০১০ থেকে ২০১২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ‘এ্যাকশান রিসার্স অন ইকোলজিক্যাল অলটারনেটিব ইন স্যানিটেশন ইন ডিপিকাল্ট এরিয়া অব বাংলাদেশ’ ও ‘আনলকিং পটেনশিয়াল ইন স্যানিটেশন ইন ডিপিকেল্ট এরিয়া অব বাংলাদেশ এ্যাডাপটিং ইকোলজিক্যাল এ্যাপ্রোচ্’ প্রকল্পের মাধ্যমে বান্দরবানের আলীকদম ও থানছি উপজেলায় ৮টি কাস্টারে ১৫২টি ইকো টয়লেট নির্মাণ করা হয়। এ ধরণের প্রকল্প চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও গাইবান্ধা জেলায়ও বাস্তবায়ন হয়েছে। এখন বাবু পাড়ার পর নয়া পাড়ায় প্রকল্পের ইকো টয়লেট নির্মাণ কাজ চলছে। কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে জনস্বাস্ব্য প্রকৌশল অধিদপ্তর।

সম্প্রতি আলীকদম অফিসার্স কাবে প্রকল্পের ধারণা সর্ম্পকিত সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তাদের নিয়ে সভার আয়োজন করে স্পেস। ওই সভায় মানববর্জ্য থেকে জৈব সার তৈরী বিষয়টি ধারণা দেন স্পেসের কর্মকর্তারা। ওই সভায় কর্মকর্তারা বিভিন্ন প্রশ্ন রাখেন। তবে সদুত্তর মেলেনি বলে দাবী অংশগ্রহণকারীদের।

এদিকে স্পেস থেকে দাবি করে বলা হয়, ‘রাসায়নিক সারের বিকল্প হিসেবে মানুষের ত্যাগকৃত মল-মূত্র একটি প্রক্রিয়াকরণের মধ্যে দিয়ে জৈব সার উৎপাদন ও কৃষিজমিতে ব্যবহার করে পরিবারভিত্তিক খাদ্য নিরাপত্তায় সহায়তা করা হচ্ছে’।  ইকো টয়লেটে পানি সাশ্রয় হয়। মানববর্জ্য থেকে উৎপাদিত জৈব সার জমিতে ব্যবহারের নানা প্রক্রিয়া নিয়ে সভায় অবহিত করা হয়। প্রকল্পের বড় অংকের আর্থিক খরচ জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের মাধ্যমে ব্যয় করার কথা রয়েছে। টয়লেট তৈরী ২৫-৩০ ভাগ ব্যয়ভার উপকারভোগীরা বহন করছেন। মানববর্জ্য থেকে সার তৈরীর পদ্ধতি স্বাস্থ্য ও পরিবেশবান্ধব নয় বলে অবিহিতকরণ সভায় মত দেন অনেক কর্মকর্তা।

মানুষের মল-মুত্র থেকে জৈব সার তৈরী ও কৃষি ক্ষেতে প্রয়োগের বিষয়ে উপজেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. নজরুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি আপতত দৃষ্টিতে স্বাস্থ্যকর ও পরিবেশবান্ধব বলে মনে হচ্ছে না। মানববর্জ্যে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া, আমাশয় ও ক্রিমির জীবানু থাকার আশংকা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের ছাড়পত্র থাকা প্রয়োজন বলে মত দেন এই কর্মকর্তা। তবে উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী মনির আহমেদ বলেন, ইকো টয়লেটের নিয়ে সরকারি ও বেসরকারী পর্যায়ে আনেক পরীক্ষা-নীরিক্ষা হয়েছে। মানববর্জ্য নির্দিষ্ট সময়ের পর কম্পোস্ট সার তৈরী করলে স্বাস্থ্য ও পরিবেশের কোন ক্ষতির আশংকা নেই।

স্পেস এর প্রকল্প ব্যবস্থাপক মো. আব্দুছ ছালাম মিয়া জানান, ২০১৩ সালের নভেম্বর থেকে ‘ইনহানচিং প্রোমোশন অব স্যানিটেশন ইন ডিপিকাল্ট এরিয়াস্ অব বাংলাদেশ এ্যাডাপটিং ইকোলজিক্যাল এ্যাপ্রোচ্’ প্রকল্পের আওতায় নয়াপাড়া ও বাবুপাড়ায় ১৫০টি ইকো-টয়লেট নির্মাণ কাজ চলছে। এর আগেও বাবু পাড়ায় ৪৬টি ইকো-টয়লেট তৈরী করা হয়েছে। এসব টয়লেটের মানববর্জ্য উপকারভোগীরা ফসলে জৈব সার হিসেবে ব্যবহার করছেন।

প্রকল্প এলাকায় সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, ইকো-টয়লেটে দুইটি চেম্বারে মল-মূত্র ত্যাগের ব্যবস্থা রয়েছে। টয়লেটে মল-মুত্র আলাদাভাবে সংরক্ষণের ব্যবস্থাও রয়েছে। একটি চেম্বার ৬ মাস ব্যবহারের পর পরবর্তী ৬ মাস বন্ধ রাখতে হয়। ৬ মাস পর মল শুকিয়ে জৈব সারে রুপান্তর হয়। আর টয়লেটের প্রস্রাব আলাদা একটি নির্দিষ্ট কনটেইনারে জমা হয়। এই প্রস্রাবের সাথে পাঁচগুণ পানি মিশিয়ে ‘নাইট্রোজেন’ হিসেবে ফসলে ব্যবহার করা যায়।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ আলী আহমেদ বলেন, সব প্রাণীর বর্জ্য এক সময় জৈব সারে পরিণত হয়। এক্ষেত্রে মানববর্জ্যও নির্দিষ্ট সময়ের পর জৈব সার হয়। তা কৃষিক্ষেতে ব্যবহার করা যেতে পারে বলে অভিমত দেন তিনি।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তা ডা. মো. মোখলেছুর রহমান বলেন, মল-মুত্র থেকে জৈব সার তৈরী ও কৃষি জমিতে প্রয়োগের বিষয়ে সরকারের কোনো পর্যায় থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানা হয়নি। বিষয়টি সম্প্রতি জেনেছি। তবে এই জৈব সার পরিবেশ ও স্বাস্থ্যবান্ধব কিনা পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া নিশ্চিত করে কিছু বলা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।

–হিলবিডি২৪/সম্পাদনা/সিআর.

Print Friendly